বাঘাইছড়িতে দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত ৭ আহত ২০ ॥ ১০ উপজেলায় নির্বাচন সম্পন্ন

63

॥ স্টাফ রিপোর্টার ॥

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে রাঙামাটির দুর্গম বাঘাইছড়িতে সন্ত্রাসীদের ব্রাশ ফায়ারে ঘটনাস্থলেই ৭ জন নিহত হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাঘাইছড়ি-সাজেক সড়কের নয় কিলো নামক স্থানে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যসহ মোট ২০জন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরতর আহত হয়।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন রাঙামাটির পুলিশ সুপার মোঃ আলমগীর কবির। নিহতদের মধ্যে একজন প্রিজাইডিং অফিসার আতিকুর রহমান হান্নানসহ দুইজন সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার ও একজন পোলিং অফিসার রয়েছেন বলে স্থানীয়দের মাধ্যমে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, হতাহতরা সকলেই সোমবার অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া উপজেলা নির্বাচনে দায়িত্ব পালন শেষে নির্বাচনী কাগজপত্র নিয়ে নির্ধারিত গাড়িতে করে বাঘাইছড়ি সদরে আসার সময় নয়কিলো নামক স্থানে আগে থেকেই ওঁৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা এ হামলা চালায়। নিহদের মধ্যে দু’জন আনসার-ভিডিপি সদস্য, একজন সহকারী শিক্ষিকা রয়েছেন বলে জানানো হয়। এছাড়া এ ঘটনায় আরো ২০জন আহত হয়েছে।

সন্ধ্যা সাতটার সময় হামলায় ঘটনাস্থলেই ছয়জন নিহত হলেও রাত দশটা নাগাদ মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৭ এ পৌছে। বাঘাইছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ মঞ্জুরুল আলম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, রাত দশটার সময় চিকিৎসাধীন অবস্থায় আহত আবু তৈয়ব নামে আরো একজন সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার মৃত্যুবরণ করেন।

প্রসঙ্গত ওই এলাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি  (জেএসএস) প্রার্থী বড় ঋষি চাকমা নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে সকালেই নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেয়।

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাদিম সারোয়ার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আহতদের উদ্ধার করে হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রামের সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আহত ২০ জনের মধ্যে ১৮ জনের নাম জানা গেছে তারা হলেন, জাফর ইকবাল, ফুল কুমারি, বিদোলাল চাকমা, ইসমাইল, মামুন, আব্দুল আলিম, আবু ইউসুফ, নিরু বিকাশ চাকমা, কাঞ্চন, কবির, বদরুল, সাদ্দাম, এনামুল হক, মাহাবুবুল আলম, বদিউল আলম, হান্নান ও সোহেল।

এদিকে সর্বশেষ স্থানীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে হেলিকপ্টারে দুই দফায় আহত ১১ জনকে চট্টগ্রামস্থ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাকিদেরও পর্যায়ক্রমে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে হেলিপ্যাডে রাখা হয়েছে। সে সময় আরো জানা যায়, রাত পৌনে নয়টার সময় বাঘাইছড়ির মাচালং পুলিশ ক্যাম্পে সন্ত্রাসীরা আবারো ব্রাশ করেছে।

৫ম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে গতকাল সোমবার রাঙামাটির ১০ উপজেলায় নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হয়। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এবং বেশ কয়েকটি উপজেলায় সরকার দলীয় প্রার্থীর সাথে আঞ্চলিক দলীয় প্রার্থীর তুমুল প্রতিদ্বান্দ্বিতার সম্ভাবনা থাকায় নির্বাচন ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা গ্রহণ করা হয়। তবে ভোট গ্রহণের সকাল থেকেই কেন্দ্রগুলোতে তেমন কোনো নির্বাচনী আমেজ ছিল না। উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকাগুলোর কিছু কিছু কেন্দ্রে দীর্ঘ লাইন দেখা গেলেও বেশির ভাগ কেন্দ্রে তেমন কোনো ভোটার উপস্থিতি ছিল না। ভোটারা বিক্ষিপ্ত ভাবে কেন্দ্রে এসে ভোট দিয়েছেন বলে জানান নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে রত প্রিজাইডিং অফিসাররা। দশ উপজেলা কেন্দ্র করে রাঙামাটি জেলার ২০৮টি ভোট কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। ভোট গ্রহণ শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘœ করতে রাঙামাটির প্রত্যেক ভোট কেন্দ্রে সেনাবাহিনী র‌্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

রাঙামাটির ১০ টি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে ২২ জন, পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৩১ জন ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ২৬ জন  প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। দশ উপজেলায় মোট ভোটার রয়েছে ৪ লাখ ১৮ হাজার ২৪৮ এর মধ্যে (পুরুষ-২লাখ ২০হাজার ৩৯৫, মহিলা-১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৩৫জন)।

এদিকে কারচুপির অভিযোগ এনে সোমবার সকাল নয়টার সময় নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন রাঙামাটির সীমান্তবর্তী উপজেলা বাঘাইছড়ির স্বতন্ত্র প্রার্থী বড়ঋষি চাকমা। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগের দিন রাতেই বহিরাগতদের মাধ্যমে ভোট বাক্সগুলো ভরে রাখা হয়। সকালে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি নির্বাচন বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছেন বলে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি জেএসএস সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী বড়ঋষি চাকমা।

আওয়ামী লীগ বাঘাইছড়ি ও নানিয়ারচর উপজেলা বাদে রাঙামাটির ৮টি উপজেলায় দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। এর মধ্যে কাপ্তাই ও লংগদু উপজেলায় প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় আওয়ামী লীগের দুই জন চেয়ারম্যান প্রার্থী এর আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করেন।

প্রসঙ্গত, গুলির ঘটনার স্থানটি পার্বত্য চুক্তি বিরোধী সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ইউপিডিএফ এর নিয়ন্ত্রণাধীন। নিরাপত্তাবাহিনীর ধারনা উক্ত দলটির সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে।

নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে রাস্তার পাশে উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে স্বয়ংক্রিয় ভারী অস্ত্র দিয়ে ব্রাশ ফায়ার করেছে সন্ত্রাসীরা। এই ঘটনায় গাড়িতে থাকা লোকজনের প্রায় সকলেই গুলিবিদ্ধ হয়। খবর পেয়ে স্থানীয় সেনা-বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে হতাহতদের উদ্ধার করে বাঘাইছড়ি স্বাস্থ্য কমপে¬ক্সে নিয়ে আসে।