সাংবাদিকদের দৃঢ়তার কারণেই পরিশেষে গুজবটি সংবাদ হতে পারলো না

57

॥ আনোয়ার আল হক ॥

সাংবাদিকরা ফাঁদে পা দেয়নি বলেই শেষ পর্যন্ত ছাইচাপা আগুন ছাইয়ের মধ্যেই পানি হয়ে গেছে। প্রসঙ্গটা বুধবারে রাঙামাটির গুজব নিয়ে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নানা রাজনীতির মেরুকরণে বিদগ্ধ। আর গুজবের ভিত্তিতে অতীতে এই এলাকায় ঘটে গেছে অনেক বড় বড় ঘটনা। বুধবার রাঙামাটিতে ছড়িয়ে পড়া গুজব রাঙামাটিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। নাড়া দিয়েছে সমগ্র বিশ্বকে। তবে এই গুজব ছড়িয়ে পড়ার জন্য দু’একজন সাংবাদিককে সামান্য দায়ী করা গেলেও, শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকদের দৃঢ়তার কারণেই এ গুজব হালে পানি পায়নি।

বাতাসে ছড়ানো গুজবটি শেষ পর্যন্ত সফলতা লাভ করলে এর প্রতিক্রিয়া কি হতে পারতো সে বিশ্লেষণ এখন অনেকটা অবান্তর। কিন্তু গুজবটি আরো বাড়তে পারতো এবং এর ভিত্তিতে অনেক কিছুই ঘটতে পারতো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

খবরটি যেহেতু সাতজন মানুষ মরে যাওয়ার মতো ঘটনা। মরে যাওয়াটা আবার এমনিতেই নয়, গুলি খেয়ে। সেই গুল্ওি আবার এক পাক্ষিক নয়; দু’পক্ষের মধ্যে। এমন খবরটি সংবাদিকদের তো ব্যতিব্যস্ত করবেই। এই আগ্রহ এবং দায়বদ্ধতা থেকে যে দু’ একজন সাংবাদিক ¯œায়ুযুদ্ধে হেরে সংবাদ পরিবেশন করে ফেলেছেন, তাদের দায় এড়াবার হয়তো সুযোগ নেই। তবে খবরটি চাউর হওয়ার জন্য সেই দু’একজন সাংবাদিক যতটা না ইন্দন যুগিয়েছেন; তার চেয়ে অনেক বেশি ইন্দন হয়ে কাজ করেছে, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা। মুঠোফোন এবং সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে বিষয়টি এক ঘন্টার মধ্যেই বিশ্বব্যপী মিডিয়াগুলোকে জেগে উঠতে বাধ্য করেছে।

খবরটি ছিল ‘দুর্গম রাজস্থলীর খোয়াই থুই পাড়ায় ভোর পাঁচটায় দু’টি অস্ত্রধারী গ্রুপের মধ্যে ঘন্টাব্যপী বন্দুক যুদ্ধে ৭জন নিহত ও অসংখ্য আহত হওয়ার’ বিষয়ে। সেখানে জড়িয়ে ছিল একাধিক অস্ত্রধারী গ্রুপের নাম এমনকি আরাকান লিভারেশন আর্মি ইত্যাদি ইত্যাদি।

এমন একটি খবর চাউর হওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসনের কিংকর্তব্য বিমুঢ়তা এসে থাকলেও অস্বাভাবিক নয়। তারা তৎপর হয়েছেন বেশ তড়িৎ, তবে দৃঢ়ভাবে সংবাদটি উড়িয়ে দিতে না পারার কারণে গুজব ছেড়ে দেওয়া চালবাজরা অনেকটাই সফল হয়ে গিয়েছিল। এসময় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বরাত দিয়ে যে দু’টি মিডিয়া সংবাদটি প্রচার করেছে, দোষটা তাদের নাকি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের এই লেখা পর্যন্ত তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তবে রাঙামাটির সাংবাদিকরা ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং অধিকতর নিশ্চিত হবার বিষয়ে তাদের নীতিতে অটল ছিল বলেই শেষ পর্যন্ত সংবাদটি গুজব নাম ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে। তাই বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কোনটা সংবাদ এবং কোনটা গুজব তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংবাদিকদের উপরই বর্তায়। এই দায়িত্ববোধ থেকেই রাঙামাটির সাংবাদিকরা তাদের সেন্ট্রাল ডেস্কের শত চাপের মুখেও গতকাল বুধবার দৃঢ় ছিলেন বলে আমি রাঙামাটির সংবাদকর্মীদের সিংহভাগ কৃতিত্ব দিতে চাই।

স্থানীয় সংবাদকর্মীদের ঢাকা থেকে বার বার তাড়া দেওয়া হলেও তারা নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রশাসনের ঊর্ধতন কর্তাদের বারবার বিরক্ত করেছে। আর এই বারবার বিরক্ত করার কারণেই হয়তো এক সময় জেলাপ্রশাসক বিষয়টি দ্রুত নিশ্চিত হওয়ার গরজ অনুভব করেন। তাঁকে ধন্যবাদ যে, তিনি সময় মতো নিশ্চিত করেছেন যে, এটা আসলে গুজব এবং এই ঘটনার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

পার্বত্য চট্টগ্রামে এমন গুজব হর হামেশাই ছড়ানো হয়। আর এর কুপ্রভাব যে কতটা ভয়াবহ তা পাহাড়ের মানুষের অজানা নয়। তবুও তারা গুজবে কান দিতে দেরী করেন না। এ বিষয়ে আরো একটু সতর্ক থাকার বিষয়ে সচেতন হবার এখনই সময়।

যাইহোক আমি এ লেখায় আরো দু’জন কর্মকর্তাকে বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার বলে উল্লেখ করতে চাই, এর মধ্যে একজন রাঙামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবির। যিনি প্রথম থেকেই দৃঢ়তার সাথে বলেছেন ‘নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমি কোনো মন্তব্য বা কি শুনেছি তাও বলতে চাই না’; তাঁর দৃঢ়তা এবং শেষে জেলাপ্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদের তড়িৎ বক্তব্যের কারণে সংবাদকর্মীরা তাদের দায়িত্বটুকু বুধবার যথার্থভাবেই পালন করতে পেরেছেন এবং প্রমাণ করে দিয়েছেন গুজব আর সংবাদের পার্থক্য গড়ে দেয় গণমাধ্যম কর্মীরাই। তারাই জাতির বাতিঘর।