ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব

39

॥ অধ্যাপক মাওঃ জাহাঙ্গীর আলম ॥

আরবী ভাষায় শিক্ষা শব্দটি এসেছে তা’লীম ও তাদরীস থেকে, যার অর্থ হলো জ্ঞান দান ও পাঠদান। বাংলা, ইংরেজী ও আরবী ভাষায় শিক্ষার শাব্দিক অর্থের সারমর্ম হচ্ছে একজন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করার মাধ্যমে মেধার বিকাশ ঘটানো এবং নেতৃত্বদানের যোগ্য করে গড়ে তোলা। আর একজন মানুষকে তাঁর ¯্রষ্টা বা আল্লাহ সম্পর্কে জানা এবং নিজের মন, দেহ ও আত্মার সম্মিলিত উন্নতি সাধনের মাধ্যমে নিজেকে চরিত্রবানরূপে গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রকৃত মানুষ তৈরীর যে নিরন্তর প্রচেষ্টা- তাকেই শিক্ষা বলে।

শিক্ষা মানুষের মর্যাদার প্রতীক। মহান আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে শিক্ষা অর্জনের সকল ক্ষমতা ও যোগ্যতা দিয়েই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দান করেছেন। মানবজাতির পিতা ও প্রথম নবী হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করে স্বয়ং আল্লাহ তা’য়ালাই জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। এইভাবে সকল নবীকেও জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন মহান আল্লাহ। আর সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে।
শিক্ষা মানুষকে জাহেলিয়াত থেকে মুক্তি দেয়, উন্নত করে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় বসায়। আর শিক্ষা অর্জন না করলে মানুষের জীবন মূল্যহীন হয়ে যায়। মানবজাতির উষালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে কেউই ভিন্নমত পোষণ করেন নি, করবেনও না। ‘শিক্ষাহীন মানুষ লবনবিহীন তরকারির মতো’ সুতরাং শিক্ষা অর্জনের প্রতিযোগিতা বর্তমান মানবজাতির মধ্যে ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। একজন মানুষের জন্মের পর শুরু হয় শিক্ষা অর্জন কার্যক্রম। আর চলে মৃত্যু পর্যন্ত। শিক্ষা অর্জনের কোন বয়স নেই, তেমনি শিক্ষারও কোন শেষ নেই।
জীবনের সব দিক ও বিভাগের উপর ইসলামের প্রভাব বিদ্যমান থাকা অপরিহার্য। ইসলামের অনুসারীরা ব্যক্তিগতভাবে হবেন উন্নতগুণসম্পন্ন, আদর্শবাদী মানুষ, জনদরদি ও সার্বিক কল্যাণকামী মানুষ এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের উত্তম নাগরিক।

ইসলামে ইলম শব্দটি খুবই পরিচিত শব্দ। যার অর্থ ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান। ইলম অর্জনকে ইসলামে ফরজ বলা হয়েছে। যিনি এই পৃথিবীসহ সকল প্রাণী সৃষ্টি করেছেন, তিনিই একমাত্র সকল জ্ঞানের উৎস। আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিগতভাবেই মানুষকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান দান করেছেন। মানব সন্তান কোন রকম জ্ঞান ছাড়াই জন্মগ্রহণ করেন। তবে আল্লাহ তার মধ্যে জ্ঞানের প্রতি ভালবাসা এবং নিজেকে জানার আগ্রহ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তিনি তার মধ্যে জানার জন্য সব উপায় উপকরণও সৃষ্টি করেছেন। যেমন মহান আল্লাহ সুরা নাহলের ৭৮ নং আয়াতে বলেন “এবং আল্লাহ তোমাদেরকে নির্গত করেছেন মাতৃগর্ভ হতে এবং এ অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের দিয়েছেন শ্রবণ শক্তি, দৃষ্টি শক্তি এবং হৃদয়, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো”।

এই উপকরণগুলো কাজে লাগিয়েই মানুষ পার্থিব জ্ঞান ও ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করে। আল্লাহর নিয়ম হলো তিনি বৃষ্টির মতো জ্ঞানকে মানুষের উপর বর্ষণ করেন না বরং ইলম অর্জনের জন্য মানুষকে চেষ্টা ও সাধনা করতে হয়। সুতরাং ইলম বা জ্ঞান থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা বা অনাগ্রহী থাকা কোন মু’মিন বা মুসলমানের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। মানুষকে সচেতনভাবে এবং ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করেই আল্লাহর দেয়া উপকরণ ও নেয়ামতকে কাজে লাগিয়ে ইলম অর্জন করতে হবে। আর আল্লাহ তা’আলা মানুষকে নিজেকে এবং এই পৃথিবীকে কিভাবে পরিচালনা করবে, কোন গুণাবলী কিভাবে অর্জন করবে, কোন বিধান কিভাবে বাস্তবায়ন করবে- যাবতীয় জ্ঞান রাসুল (সাঃ) এর নিকট ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। তাই আল্লাহর নাযিলকৃত কুরআন ও রাসুলের হাদীসই আমাদের সঠিক ও পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম।

একজন মানুষ কোটিপতি হতে পারে, অনেক টাকার মালিক হতে পারে, অনেক বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হতে পারে, প্রিন্সিপাল, ভাইস চ্যান্সেলর হতে পারে, অনেক বড় নেতা হতে পারে, অনেক জায়গা-জমির মালিক হতে পারে; তা দেখে সফল ব্যক্তি মনে করার কোন কারণ নেই। সত্যিকার অর্থে দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে অল্প কিছু দিনের জন্য সূখ ভোগ করার পরে কোটি কোটি বছরের অনন্ত জীবনে যদি জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হয়, তাহলে তাকে সফল বলা যায় না। প্রকৃতপক্ষে সূখী হবে সেই ব্যক্তি, যে ব্যক্তি দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে যেভাবেই জীবন যাপন করুক না কেন, দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা, যন্ত্রনা যা কিছুই হোক না কেন, মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবনে যদি সে জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে যেতে পারে এবং জান্নাতে গমন করতে পারে, তাহলেই সে প্রকৃত সফল, প্রকৃত সুখী। ছেলে-মেয়ে, ছাত্র-ছাত্রী, শ্রমিক-কর্মচারী ও শাসক-শাসিত সকলকেই জীবনে প্রকৃত সফলতা কাকে বলে তা জানতে হবে। সে অনুযায়ী জীবনের চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করার জন্য এখানেই চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এখানে ভুল হয়ে গেলে এভুলের আর কোন সংশোধন করা যাবে না। সেজন্য সকলকে সফলতার স্বচ্ছ ধারনা রাখতে হবে।
পার্থিব জীবনের প্রয়োজনে যত প্রকার বিদ্যা শিক্ষা অর্জন করতে হয় সে সবকেই ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা অর্জন করতে হবে। শিক্ষার পরিবেশকে দ্বীনি পরিবেশে পরিণত করতে হবে। ভালোকে ভালো হিসাবে জানা ও গ্রহণ করা এবং খারাপকে খারাপ হিসাবে জানা ও তা উৎখাত করা। ইসলামের যৌক্তিকতা ও শ্রেষ্ঠত্ব মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের মনে বদ্ধমূল করতে হবে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সুরা আলাকের শুরুতে বলেন- “পড়ো তোমার রবের নামে”। এটাই হচ্ছে ইসলামী শিক্ষার মূল কথা। যে কোন শিক্ষার সাথে আল্লাহর অবদানকে স্বরন রাখতে হবে। পার্থিব জীবনের প্রয়োজনীয় যাবতীয় শিক্ষাকে ইসলামী দৃষ্টি ভঙ্গিতে শিক্ষা দান করতে হবে।
ইসলামী শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যার মাধ্যমে একজন মুসলিম প্রকৃত মুসলিম হিসেবে গড়ে উঠবে। যার ফলে দুনিয়ার শান্তি ও আখেরাতের মুক্তি লাভ করতে পারে। যাদেরকে দ্বীনের জ্ঞান দান করা হয়েছে তাদেরকে বিশেষ মর্যাদান দান করা হয়েছে। সূরা যুমার ৯ম আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন “হে নবী আপনি বলে দিন, যে ব্যক্তি জানে আর যে জানে না তারা কি উভয়ে সমান হতে পারে ? তার মানে, তারা দু’জন সমান হতে পারে না”। আল্লাহ তা’য়ালা তার ইবাদত বন্দেগি করার জন্য মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে সঠিক দিক নির্দেশনা দেওয়ার জন্য যুগে যুগে নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন। নবী ও রাসূলদের মূল কথা ছিল আল্লাহ এক ও তার কোন শরীক নেই। একমাত্র তারই হুকুম মানতে হবে। যার ফলে মানুষ দুনিয়ায় শান্তি ও আখেরাতের মুক্তি লাভ করতে পারবে।
শিক্ষার উদ্দেশ্যে হচ্ছে ব্যক্তিকে তার সামগ্রিক জীবনে উদ্দীপনা সৃষ্টি করা। শিক্ষার্থীদের চিন্তা চেতনায় আল্লাহভীতি, পরকালীন জবাবদিহিতা, ন্যায়বোধ, কর্তব্যবোধ, শিষ্টাচারবোধ, সচেতনতা, শৃঙ্খলা, সামাজিক সম্প্রীতির বিকাশ ঘটানো। দেশের উন্নয়ন অগ্রগতি সাধনের জন্য শিক্ষাকে প্রয়োগমুখী উৎপাদন সহায়ক ও সৃজনধর্মী করে তোলা। আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামী শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োগের তৌফিক দান করুন। [লেখক: উপাধ্যাক্ষ, আল আমীন ফাজিল ডিগ্রী মডেল মাদ্রাসা]