এশিয়া জয় করা পাহাড়ের সোনালী কন্যাদের রাঙামাটিতে বিরোচিত সংবর্ধনা/

90

॥ স্টাফ রিপোর্টার ॥

সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপের মুকুট মাথায় নিয়ে আসা সোনাজয়ী পাহাড়ের সোনালী কন্যাদের ঘিরে আরেক ইতিহাস রচনা করলো রাঙামাটিবাসী। বৃহস্পতিবার রাঙামাটি মারি স্টেডিয়ামে পাঁচ পাহাড়ি কন্যাকে শুধু বিরোচিত সংবর্ধনা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, পুরস্কারে পুরস্কারে আর ফুলেল শুভেচ্ছার বন্যায় আপ্লুত করেছে তাদের। ফলবতি বৃক্ষের মতো নমনীয় মেয়েরা হাসিমুখে আঁজলা ভরে নিয়েছে পুরস্কার আর শুভেচ্ছা।

এশিয়া জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা সাফ জয়ী পাঁচ পাহাড়ি নারী ফুটবলারের জন্য এ সংবর্ধনার আয়োজন করে যৌথভাবে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ ও রাঙামাটি জেলাপ্রশাসন। পুরো অনুষ্ঠান ঘিরে স্টেডিয়াম ছিল লোকে লোকারণ্য। অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ঘোষণা দেন যে, খুব অল্প সময়ের মধ্যে পাহাড়ের ফুটবল প্রতিভাদের উৎসাহিত করার লক্ষ্যে আবাসিক সুবিধাসহ একটি ফুটবল একাডেমী প্রতিষ্ঠা করা হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি দীপংকর তালুকদার এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা। বক্তব্য রাখেন, জেলাপরিষদ চেয়ারম্যান অসুই প্রু চৌধুরী ও জেলাপ্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। এর আগে একটি বিশাল মোটর শোভাযাত্রাসহ সদর উপজেলার প্রবেশমুখে পাঁচ খেলোয়াড়কে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নেওয়া হয়।
খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে অনুভূতি ব্যক্ত করেন চপলা কিশোরী ঋতুপর্ণা চাকমা। আবেগ উচ্ছাশ আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি সে স্মরণ করে তার ছোটবেলার কোচ ও শিক্ষকদের। যারা তাকে শত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে সাফল্যের সিঁড়িতে তুলে দিয়েছিলেন।

অনুষ্ঠানে প্রতি খেলোয়ারড়কে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে দুই লক্ষ টাকার চেক, জেলাপ্রশাসনের পক্ষ থেকে এক লক্ষ টাকার চেক, এমপি এবং উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান পৃথকভাবে নিজদের পক্ষ থেকে নগদ টাকা প্রদান ছাড়াও সেনবাহিনীর রাঙামাটি সদর জোন কমান্ডার লেঃ কর্নেল বিএম আশিকুর রহমান, বিজিবি সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তরিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মীর আবু তৌহিদ ও রাঙামাটি পৌরসভার মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী শুভেচ্ছা উপহার, নগদ অর্থ এবং ক্রেস্ট ও উত্তরীয় পরিয়ে দেন। এ ছাড়াও রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থা, রাঙামাটি মহিলা ক্রীড়া সংস্থা, জেলা ফুটবল একাডেমী, মারমা সংস্কৃতি সংস্থা ও ঘাগড়া ইউপির পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা স্মারক প্রদান করা হয়।

বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে সম্মানিত করার এই পাহাড়ি নায়িকারা প্রায় অন্ধকার থেকে উঠে এসেছেন আলোর মঞ্চে। পাহাড়ের পর্ণ কুটিরে জন্ম নেওয়া এই কিশোরীদের সবার বাবা অতি দরিদ্র কৃষক, তৃণমূলের অভাবী পরিবারের কিশোরীরাও যে সুযোগ পেলে জাতীয় মর্যাদা বয়ে আনতে পারে জাতিকে সেটাই দেখিয়ে দিয়েছে এই ফুটবলাররা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পার্বত্য তিন জেলায় ফুটবলের এতিহ্য আবহমান কাল থেকেই। স্বাধীনতার আগে থেকেই পাহাড়ে ছেলেরা জাতীয় পর্যায়ের ফটবলে নিয়মিত অবদান রেখে এসেছেন। তবে এবার পাহাড়ের পাঁচ কিশোরির অর্জন অতীতের সকল অর্জনকে ছাপিয়ে গিয়েছে বলে মনে করছেন পাহাড়ের মানুষ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দীপংকর তালুকদার এমপি বলেন, পরিশ্রম অধ্যাবসায় আর মনোবল দৃঢ় থাকলে মানুষের কাজে তাকে কত উপরে নিয়ে নিয়ে যেতে পারে আজকে পাহাড়ের এই পাঁচ কিশোরী ফুটবলার তার জলন্ত উদাহরণ।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এক সময় পরিচিত ছিল প্রকৃতিক দুর্যোগে আর বন্যা প্রবন দেশ হিসেবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্ব সেই বাংলাদেশকে আজ নানা ধরণের তাচ্ছিল্য তকমা থেকে বের করে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে দাঁড় করিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা বলে থাকি বৈচিত্রময় সংস্কৃতির দেশ, আমাদের এই বাংলাদেশ। নারী ফুটবলারদের টিম স্পীরিটের কারণে সেই বৈিিচত্র আজ মূর্ত হয়ে উঠেছে। সারাদেশের ফুটবল প্রতিভাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই বিজয়ীনী বীর নারীরা দেশের পতাকাকে এশিয়ার সেরা সিরোপা এনে দিয়ে জাতির কল্পনার রাজ্যে বাস্তবে পৌঁছে দিয়েছে।

জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি ক্রীড়ার উন্নয়নে জেলা পরিষদ সব সময় যেভাবে অবদান রেখে এসেছে তা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সময়ের স্বল্পতার কারণে আমরা অনুর্ধ ১৯ নারী ফুটবল দলের সকল খেলোয়াড় এনে সংবর্ধনা দিতে পারিনি। আমরা পাহাড়ের মানুষের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

জেলাপ্রশাসক তার বক্তব্যে রূপনা ঋতুপর্ণাদের অধ্যাবসায় অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তোমাদের অসাধারণ নৈপুন্যের কারণে আজ সমগ্র বাংলাদেশে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। তোমরা জাতির এই উচ্ছাস চির স্মরণে রাখবে এবং মনে রাখবে তোমাদের হতে হবে ফলবতী বৃক্ষের মতো নমনীয়।
প্রসঙ্গত, সাফজয়ী পাহাড়ি পাঁচ নায়িকার মধ্যে রূপনা চাকমার বাড়ি নানিয়ারচর উপজেলায়, আর ঋতুপর্ণার বাড়ি কাউখালী উপজেলার ঘাঘড়ায়। অন্যদিকে দুই সহোদর জমজ বোন আনাই মগিনিী ও আনুচিং মগিনী এবং মনিকা চাকমার বাড়ি বান্দরবানে।

বৃহস্পতিবার তাদের ঘাঘড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও ঘাঘড়া সেনা জোনে আরো দুটি পৃথক সংবর্ধনায় ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়।