ঘোর অনিশ্চয়তার মাঝেই আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব পর্যটন দিবস

679

॥ আনোয়ার আল হক ॥

বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক নৈস্বর্গের লীলাভূমি বলে আমরা সকলেই গর্ব করি। সেই বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়েতো স্তুতি ও আর কাব্যময় বর্ণনার কোনো শেষ নেই। অরণ্য সুন্দরী রাঙামাটির কাছে একবার যারা এসেছে তারা বার বার এ ভূমিতে ফিরে আসতে চায় প্রতিনিয়ত। বন-বনানীর কাব্য, মেঘ পাহাড়ের মিতালী; হ্রদের স্বচ্ছ জলরাশির আধ্যাত্মিক শোভা; প্রকৃতি প্রেমিদের পাগল করে দেয়। তাই এই ভূমিতে রয়েছে পর্যটন ব্যবসার অপার সম্ভাবনা। একথা সর্বজন স্বীকৃত এবং এ নিয়ে স্বপ্নে শেষ নেই। কিন্তু স্বপ্ন বাস্তবায়নে নেই উদ্যোগ; নেতৃবৃন্দের মাঝে নেই চেতনা।

বাংলাদেশ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন সম্ভবনা এবং সমস্যার দোলচলের মাঝেই আজ আবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব পর্যটন দিবস। এমন দিনে পর্যটন নিয়ে দু’কলম না লিখলে বাংলাদেশের একজন লেখক হিসেবে নিজেকে দায়ী মনে হয়। বাংলাদেশ আর পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্প নিয়ে বাগাড়ম্বতার যেমন শেষ নেই, তেমনি স্বপ্নের জাল বোনায়ও কমতি নেই, কিন্তু করোনা মহামারীতে ধুলোয় মিশে গেছে সে স্বপ্ন। পর্যটন ব্যবসায় নেমে এসেছে ঘোর অনিশ্চয়তা। এরই মধ্য দিয়ে আজ সোমবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব পর্যটন দিবস।

বিশ্বভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিল বলছে, মহামারী করোনার কারণে পর্যটন সংশ্লিষ্ট সাড়ে ৭ কোটি মানুষের চাকুরি অনিশ্চয়তায় পড়েছে। লোকসানের পরিমাণ কল্পনার চেয়েও বেশি। বাংলাদেশে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, মুখ থুবড়ে পড়ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন ব্যবসা। লক ডাউন খুলে গেলেও মানুষ সেভাবে বেড়াতে আসছে না।

এমন অনিশ্চয়তার মাঝেই আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস। মহামারির ধাক্কায় সবচেয়ে বিপর্যস্ত খাত হিসেবে অনিশ্চয়তার সামনে দাঁড়িয়ে এ বছর পালিত হচ্ছে দিবসটি। “ট্যুটিজম ফর ইনক্লুসিভ গ্রোথ” বা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে পর্যটন’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সারাদেশেই দিবসটি পালিত হচ্ছে আজ।

১৯৮০ সাল থেকে জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এ দিবস পালিত হয়ে আসছে। জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থাই এবারও দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে। দিবসটির প্রধান উদ্দেশ্য পর্যটন নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপযোগিতাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, করোনার প্রথম আঘাতই আসে পর্যটন খাতে। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সব ধরনের পর্যটন বন্ধ হয়ে পড়ে শুরু থেকেই। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের দাবি, করোনার কারণে বাংলাদেশে দুই বছরে কমপক্ষে ১১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পথে।

ক্ষতিগ্রস্ত পর্যটন শিল্পকে চাঙা করতে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড পর্যটন অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে ইতোমধ্যে একটি রিকভারি প্ল্যান তৈরি করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পগুলোর জন্য প্রধানমন্ত্রী যেসব প্রণোদনা ঘোষণা দিয়েছেন, তার মধ্যে পর্যটনশিল্পও অন্তর্ভুক্ত।

বলা বাহুল্য যে, দিবসটি জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ঘোষিত। আন্তর্জাতিকভাবে এমন অনেকগুলো দিবস সারা বছর পালিত হয়। তেমনি জাতীয়ভাবেও বেশকিছু দিবস পালন করা হয় প্রতি বছর। সরকারি ঘোষণা থাকায় দিবসটি সকল জেলায় এবং সারা বিশ্বেই আজ পালিত হবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, সারাদেশের অন্যসব জেলার মতো করেই যদি প্রকৃতির রাণী রাঙামাটিতেও গদবাঁধা নিয়মে দিবসটি পালিত হয়। তাতে নিরুৎসাহিত হয় অনেকেই। পক্ষান্তরে এই দিবস পালনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট খাত চাঙ্গা করার যে মহান উদ্দেশ্য থাকে তা ব্যাহত হয়। তাই সংশ্লিষ্টদের দাবি যেহেতু রাঙামাটি ঘিরে এই খাতের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এ জেলায় পর্যটন দিবসটি ব্যাপক ঘটা করে পালন করা উচিৎ। আর এই খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয়ে খুটিনাটি আলোচনার মাধ্যমে প্রতিবছর অন্তত একধাপ এগিয়ে যাবার পরিকল্পনা থাকা উচিত। তবেই দিবসটি পালনের সার্থকতা আসবে।

বাংলাদেশের ট্যুরিজম সেক্টরকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। কিছুদিন আগ পর্যন্তও রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মৌলবাদের ভয় দেখিয়ে দূরে রাখা হত পর্যটকদের। কিন্তু এ ভয় থেকে দেশ এখন অনেকটাই মুক্ত। পর্যটন খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল অবকাঠামোগত এবং অব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত। প্রথমেই আসে যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা। অনেক জায়গাতেই এখনো নেই সহজে প্রবেশের উপায়। এরপর থাকে বিভিন্ন টুরিস্ট স্পটে সিন্ডিকেটের বিষয়টি। সিন্ডিকেটের কারণে খরচ যেমন বেড়ে গিয়েছে বহুগুণে সাথে সাথে বেড়েছে নানারকম নিরাপত্তা ঝুঁকি। এছাড়া আবাসনের বিষয়টি তো রয়েছেই।

পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং রাঙামাটি ঘিরে অবকাঠামো সমস্যা যেমন দূর করতে হবে। তেমনি নিরাপত্তার বিষয়টিকে বিশেষ প্রাধান্য দিতে হবে। সর্বপোরি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ খাতের সমৃদ্ধি আনয়নে বিশেষ পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রয়োজনে একটি সমন্বিত যোগাযোগ কমিটি বা প্রেসার গ্রুপ গঠন করে জাতীয় পর্যায়ের শিল্পপতি এবং বিনিয়োগকারীদের পাহাড়ে ডেকে আনতে হবে। তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে। এমন কিছু কাজ করা দার উন্মোচন করা গেলেই তবেই এমন দিবস পালনের স্বার্থকতা আসবে।