জুম চাষে আঞ্চলিক দলের নিষেধাজ্ঞা মারধর : সাজেকের জুমিয়ারা আতঙ্কে

259

gum kishan

আলমগীর মানিক- ১৯ মার্চ ২০১৬, দৈনিক রাঙামাটি : হঠাৎ করে আঞ্চলিক দলগুলো জুমচাষের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে সাজেকের জুমচাষীরা। দূর্গম সাজেক ইউনিয়নের ৩২ পাড়ার জুমচাষিরা জানায়, এবছর জুম চাষের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় বাড়ি বাড়ি গিয়ে জুম চাষ নাকরার নির্দেশ দিয়েছে আঞ্চলিক দলগুলোর স্থানীয় নেতাকর্মীরা। কোনো প্রকার আর্থিক সহযোগিতা অথবা বিকল্প আয়ের পথ না দেখিয়ে আকস্মিক এই নিষেধাজ্ঞায় আগামী দিনগুলো কি খেয়ে বাঁচবেন এই ভাবনায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে জুমচাষের উপর নির্ভরশীল কয়েক হাজার গ্রামবাসি। এদিকে, নিষেধ করা সত্বেও জুম চাষ করতে যাওয়ার অপরাধে গ্রামবাসীকে মারধর করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে স্থানীয় অর্ধশত ত্রিপুরা গ্রামবাসী।

স্থানীয়রা জানায়, গত প্রায় একমাস ধরেই বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের কর্মীরা গ্রামবাসীদেরকে এ বছর জুম চাষ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেয়। কিন্তু পরিবারের খাবার জুটানোর আর কোনো বিকল্প পথ না থাকায় সাজেকের কয়েকটি এলাকার অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারগুলো কোনো রকম খেয়ে পরে বেঁচে থাকার তাগিদে জুম চাষের প্রস্তুতি নেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আঞ্চলিক দলের কর্মীরা ওইসব জুমচাষীদের ধরে এনে ব্যাপক মারধর করে।

খোঁজনিয়ে, স্থানীয়ভাবে আঞ্চলিক দলের কাছে মার খেয়েছেন এমন ১৫ জন গ্রামবাসীর নাম পাওয়া গেছে, তারা হলেন, ডমেন ত্রিপুরা (২২), মনেন্দ্র ত্রিপুরা (৩২), হন্তারায় ত্রিপুরা (২৭), খনে ত্রিপুরা (৪৫), ধরেন ত্রিপুরা (৩৫), থনে ত্রিপুরা (২৭), অরেন ত্রিপুরা (৩০), যোগেন্দ্র ত্রিপুরা (৩৯), হনিশা ত্রিপুরা (২৮), তনেশা (৩০) প্রনেশা ত্রিপুরা (২৪), কৃতি রঞ্চন ত্রিপুরা (৪৫) রুপচা (২৬) রঞ্জিত ত্রিপুরা (৩৮) স্বপথ ত্রিপুরা (৪৭) এলেক্স ত্রিপুরা (৩৫)। এদের সকলের বাড়ি সাজেক ইউনিয়নের বেতবুনিয়া, কাইচ্ছাপাড়া, বেটলিং, অরুন পাড়া, উজানছড়িসহ, লেংটিয়া, নিউলংকরসহ বিভিন্ন এলাকায়। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় আতংক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

জানা গেছে, সাজেকের ৩৩টি পাড়ায় কয়েক হাজার গ্রামবাসীর বসবাস। এদের মধ্যে প্রায় সকলেই ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের। গুটি কয়েক অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোক আছে যারা কিনা জুম চাষের পাশাপাশি সরকারি রিজার্ভ ফরেষ্টের গাছ ও নিজেদের সৃজিত বাগানের গাছ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের লোকজন আর্থিকভাবে চরম অস্বচ্ছল এবং পড়ালেখায়ও অনগ্রসর। এসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠির লোকেরা একমাত্র জুমচাষের উপরই জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। আঞ্চলিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও মারধরের ঘটনায় নিজেদের অস্থিত্ব নিয়েই শংকিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে সাজেকের হাজারো গ্রামবাসী। তবে তারা ভয়ে কোনো প্রশাসনের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ না করায় প্রশাসনও কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়াম্যান ও জেএসএস নেতা বড়ঋষি চাকমার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমাদের পক্ষ থেকে জুম চাষে কোনো প্রকার বাধাঁ দেওয়া হয়নি। কারা এই কাজ করেছে আমি বলতে পারবো না। তবে শীঘ্রই আমি সাজেক পরিদর্শনে যাবো। তখন স্থানীয়দের সাথে কথা বলে বিষয়টি সুরাহার উদ্যোগ নিবো।

এই ব্যাপারে বাঘাইছড়ি উপজেলার নির্বাহী অফিসার মোঃ মফিদুল ইসলাম এর কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, এই ব্যাপারে আমার কাছে কেউ কোনো ধরনের অভিযোগ নিয়ে আসেনি এবং জানায়নি। কেউ যদি প্রশাসনকে এই ব্যাপারে অভিযোগ জানায় তাহলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়েছেন নির্বাহী কর্মকর্তা। সাজেক থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ নুরুল আনোয়ার জানিয়েছেন, এই ব্যাপারটি নিয়ে থানায় কেউ অভিযোগ জানায়নি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, মূলত চাঁদাবাজির জন্যই এই ধরনের হুমকি-ধামকি দিয়েছে আঞ্চলিক দলের সন্ত্রাসীরা।

পোস্ট করেনন- শামীমুল আহসান, ঢাকা ব্যুরোপ্রধান