দিশেহারা রাজনীতি

279
সংগ্রহীত

মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার আবুল হোসেন আবু- ২৬ জুলাই ২০১৭, দৈনিক রাঙামাটি:   মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও শামছুল হক ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আজকের আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। উপস্থিত ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও আরও অনেকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তখন জেলে ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করলেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা।

১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর সিরাজুল আলম খানের নেপথ্যে পরিচালনায় মেজর আব্দুল জলিল, আ.স.ম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ ও কর্ণেল তাহেরের নেতৃত্বে জাসদ গঠিত হলো, উপস্থিত ছিলেন কাজী আরেফ আহমেদ, হাসানুল হক ইনু ও মারফত আলী মাষ্টারসহ আরও অনেকে। মেজর জলিল দলের সভাপতি ও আ.স.ম আব্দুর রব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। রাজনীতির ঘাত-প্রতিঘাতে জাসদ নেতৃত্বের অদূরদর্শিতার কারণে জাসদ কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। তন্মধ্যে বর্তমানে জাসদ (রব) ও জাসদ (ইনু) উল্লেখযোগ্য। জাসদ শুরু থেকেই রাষ্ট্রে বিজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েমে বিশ্বাসী। জাসদের নির্বাচনী প্রতীক মশাল। বহুধাবিভক্ত জাসদের এ’দুটো দল অবিভক্ত জাসদের ইমেজ ধরে রাখতে পারেনি। জাসদ (ইনু)-র নির্বাচনী প্রতীক মশাল।

১৯৫৭ সালে মাওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, মশিউর রহমান যাদু মিঞা ও অন্যান্যদের নিয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করলেন। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে ন্যাপ বিভক্ত হয়ে ন্যাপ (ভাসানী) ও ন্যাপ (মোজাফফর) হলো। ১৯৭২ সালে ড. আলীম আল রাজী ন্যাপ (ভাসানী) তে যোগদান করলেন। তাঁকে ন্যাপের সিনিয়র সহ-সভাপতি করা হলো। মশিউর রহমান যাদু মিঞা তখন ন্যাপ (ভাসানী)-র সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পক্ষান্তরে ১৯৭৬ সালে মাওলানা ভাসানী সামরিক শাসক মে. জে. জিয়াউর রহমানের অনুরোধে ন্যাপের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করলেন এবং তাঁর দলের নেতাকর্মীদেরকে ঐক্যজোটের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের সাথে রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে বললেন। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- ন্যাপ (ভাসানী)-র নির্বাচনী প্রতীক ছিল ধানের শীষ।

১৯৭৪ সালে ভাসানী ন্যাপ নেতা কাজী জাফর আহমেদ ইউনাইটেড পিপলস্ পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের প্রার্থী জিয়াউর রহমানকে সমর্থন দেন। পরবর্তীতে ইউনাইটেড পিপলস্ পার্টির কার্যক্রম স্থগিত করে জাতীয় পার্টিতে যোগদান করার পর ১৯৮৯ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান ও ন্যাপ নেতা মশিউর রহমান যাদু মিঞা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করলেন। উপস্থিত ছিলেন একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ন্যাপ নেতা মীর্জা গোলাম হাফিজ ও আরও অনেকে। মন্ত্রীত্বের লোভে ন্যাপ (ভাসানী)-র অধিকাংশ নেতাই প্রতিষ্ঠাকালীন বিএনপি-র সদস্য বনে গেলেন। প্রায় সকল নেতাকর্মীবৃন্দ জিয়াউর রহমানকে চেয়ারম্যান করে বিএনপি গঠন করায় বিএনপি ধানের শীষ প্রতীক পেলেন।

ইতোমধ্যে ড. আলীম আল রাজী পিপলস্ লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করলেন। মন্ত্রীত্বের লোভে পিপলস্ লীগের একাংশ বিএনপি-র সাথে হাত মেলালেন। ন্যাপ (ভাসানী)ও কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। তন্মধ্যে ন্যাপ ভাসানী (যাদু মিঞা), ন্যাপ ভাসানী (আখতারুজ্জামান) ও তৃণমূল ন্যাপ (ভাসানী) অন্যতম।

নির্যাতিত, নিপীড়িত, মেহনতি মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণা নিয়ে ১৯৮০ সালে অমল সেন ও ভাসানী ন্যাপ নেতা রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে ওয়াকার্স পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়। ওয়াকার্স পার্টির নির্বাচনী প্রতীক কাস্তে-হাতুরী।

১৯৯৩ সালের ২৯ আগষ্ট ড. কামাল হোসেন, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, শাজাহান সিরাজ, পঙ্কজ ভট্টাচার্য গণফোরম গঠন করলেন। অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিষ্টার আমীর-উল ইসলাম, আবুল মাল আব্দুল মুহিত (বর্তমান অর্থমন্ত্রী), সামছুদ্দোহা, মোস্তফা মহসিন মন্টু, ইঞ্জিনিয়ার আবুল হোসেনসহ ও আরও অনেকে। গণফোরামের নির্বাচনী প্রতীক উদীয়মান সূর্য।

মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার আবুল হোসেন আবু-র নেতৃত্বে ২০০৩ সালের ২৩ মার্চ বেঙ্গল জাতীয় কংগ্রেস (বিজেসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। উপস্থিত ছিলেন বিপ্লবী রাজনৈতিক নেতা মারফত আলী মাষ্টার, আইয়ুব উদ্দিন ভূইয়া ও আরও অনেকে। বিজেসি বেঙ্গল জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক সমবাদ, সামাজিক অর্থনীতি (সম্পদের সুষম বন্টন ও ব্যবহার) ও শান্তি কায়েমে বিশ্বাসী।

ন্যাপ (ভাসানী)-র ৩ দল এবং পিপল্স লীগের একাংশের নেতৃবৃন্দ জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও নীতিকেই লালন করে থাকেন। ওয়াকার্স পার্টি অবশ্য মাওলানা ভাসানীর নীতি ও আদর্শকে লালন করে থাকে। সা¤প্রতিক সময়ে বঙ্গবন্ধুকেও সম্মানের সাথে স্মরণ করে। ইদানিং জাসদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নীতি ও আদর্শকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখে থাকেন। গণফোরামের নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নীতি ও আদর্শকেই লালন করে থাকেন। বিজেসি জাতীয় ৪ নেতা শের-ই-বাঙলা এ.কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সম্মানের সাথে স্মরণ করে থাকে।

যার প্রেক্ষিতে ভাসানী (ন্যাপ), পিপল্স লীগের একাংশ, জাসদ ও গণফোরাম দেশের জনসাধারনের উল্লেখযোগ্য অংশের সমর্থন আদায় করতে পারেনি। কারণ এ ৪টি দল তাদের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাদের নীতি ও আদর্শের কথা না বলে প্রয়াত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-র শীর্ষ নেতাদের যথাক্রমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের নীতি ও আদর্শ লালন করে থাকেন।

ফলে বাংলাদেশের জনগণ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ন্যাপ (ভাসানী), পিপল্স লীগের একাংশ, জাসদ, গণফোরাম এর রাজনীতি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা করতেই পারে। বর্তমানে বহুধাবিভক্ত মুসলিম লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতি সম্পর্কেও বাংলাদেশের জনগণের নেতিবাচক ধারণা রয়েছে।

শের-ই-বাঙলা এ.কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিঃস্বার্থভাবে দেশের জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য কাজ করে গিয়েছেন। ঐ সময়ে তাঁদের রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যয় নির্বাহের জন্য সাধারণ মানুষ অর্থ সহায়তা দিতেন। স্বাধীনতাত্তোর ৮০-র দশক থেকে অদ্যাবধি উল্টো রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদেরকেই সংগঠনের ব্যয় নির্বাহের জন্য টাকা খরচ করতে হয়। কারণ বর্তমানে যারা রাজনীতি করছেন, স্বাধীনতাত্তোর তাঁদের পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল তা জনগণ জানেন। অল্পসময়ের মধ্যেই রাজনীতিবিদদের অনেকে এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অনেক ব্যবসায়ী রাজনীতিক হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ায় জনগণের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে যে, এ সকল ব্যক্তিবর্গের অনেকেই জাতীয় সম্পদ লুটপাট করেছেন। এরা আগামীতেও এমন অন্যায় কাজ করতেই থাকবেন, সুতরাং এদের দ্বারা লুটপাটকৃত অংশের সামান্যতম হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক ও নির্বাচনী কর্মকান্ডে ব্যয় করা উচিত এমন নেতিবাচক মনোভাব জনগণের মধ্যে দেখা দিয়েছে।

আজকের এ দিশেহারা রাজনীতির দোলাচলে বাংলাদেশের সাধারণ গণমানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আনয়নে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার প্রেক্ষিতে দেশের ৮৫ ভাগ মানুষের জীবনমান কষ্টদায়ক। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রয়োজন, যার বিকল্প নেই।

লেখক- সভাপতি, বেঙ্গল জাতীয় কংগ্রেস (বিজেসি) ও
জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ)

পোস্ট করেন- শামীমুল আহসান, ঢাকা ব্যুরো প্রধান।