দেড় মাসেও পূর্ণাঙ্গ সড়ক মেরামত শুরু হয়নি নিয়মের বেড়াজালে ঘুরপাক খাচ্ছে প্রকল্প প্রস্তাবনা

196

॥ আনোয়ার আল হক ॥

রাঙামাটি জেলায় বিগত ১২ এবং ১৩ জুনের ভয়াবহতম পাহাড় ধসের পর দেড়মাসেরও অধিক সময় পার হয়ে গেলেও এখনও স্বাভাবিক হয়নি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। কবে নাগাদ এই সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হবে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। এদিকে সড়ক যোগাযোগ সংকুচিত থাকায় পরিবহন ব্যবস্থায় ধস নেমে এসেছে, প্রতিনিয়ত যাত্রী সাধারণের হয়রাণী ছাড়াও কর্মহীন অবস্থায় রয়েছে অন্ততঃ দশ হাজার শ্রমিক। এই অবস্থা চলতে থাকলে রাঙামাটি জেলায় চুরি ডাকাতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অভিজ্ঞ মহল।

‘ধসের পর সাময়িকভাবে জোড়াতালি দিয়ে চালানো সড়কগুলো পরিপূর্ণভাবে মেরামত করে সড়ক যোগাযোগ কবে নাগাদ সাবলীল হবে বা কেন কাজ শুরু হচ্ছে না?’ এমন প্রশ্নে জবাবে সড়ক বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, সড়কগুলো মেরামতের লক্ষ্যে তাৎক্ষণিকভাবে প্রণীত প্রাক্কলনসমূহ অনুমোদোন না হওয়াসহ প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না আসায় তারা কাজ শুরু করতে পারছেন না। এদিকে তিনমাস বন্ধ থাকার পর কাপ্তাই হ্রদের মাছ বাজারজাতকরণ শুরু হলেও সড়ক সমস্যায় বিপাকে পড়েছে জেলে ও ব্যবসায়ীরা। এ ক্ষেত্রে নানা আঙ্গিকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সংশ্লিষ্টরা।

রাঙামাটি চট্টগ্রাম সড়কটি ধসে যাওয়ার পর দ্রুততার সাথে সাময়িক সড়ক নির্মাণ করে কর্তৃপক্ষ মানুষের মাঝে যে আসার সঞ্চার করেছিল তা এখন ক্রমেই হতাশায় রূপ নিচ্ছে। কারণ বেকার ট্রাক ড্রাইভাররা পরিবার বাঁচাতে এখন বাঁকা পথ বেছে নিয়েছে। নিষেধ থাকা সত্ত্বে সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে রাতের আঁধারে পার হচ্ছে পাঁচ টনের অধিক মালামাল বোঝাই ট্রাক। একাধিক চালক, হেলপার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে তারা নতুন সড়কের এ মাথায় ২০০ ও মাথায় ২০০ দিয়ে ট্রাক পার করে নিয়ে যান।

ইতোমধ্যে এই উপরি নিয়ে সেখানে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের সাথে ড্রাইভারদের বেশ কয়েকবার কথাকাটাকাটি এবং মারামারির ঞটনা পর্যন্ত ঘটেছে। এতে এই সাময়িক সড়কটি আবারও হুমকির মুখে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ধসে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া রাঙামাটি চট্টগ্রাম সড়কের বেইলী ব্রিজীটির কাজ চলছে ঢিমেতালে। সওজ নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদ হোসেন অবশ্য জানিয়েছেন সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই বেইলী ব্রীজ নির্মাণ কাজ শেষ হবে।

ধসে বিধস্ত হওয়ার পর দুর্গত মানুষের ত্রাণ কাজে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে সরকার ও প্রশাসন যে সুনাম অর্জন করেছে এবং স্বল্প সময়ের ব্যবধানে সড়ক চালু করে যোগাযোগ বিভাগও যে প্রশংসা পেয়েছিল তা এখন উবে যেতে বসেছে। কারণ বিপর্যয়ের পরপরই খোদ সড়ক যোগাযোগ মন্ত্রী রাঙামাটি সফর করেছেন দু’বার, এ ছাড়া যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব সড়ক বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী, ইসিবির বিগেডিয়ার জেনারেল ও জিওসিসহ উর্ধতন কর্মকর্তাদের প্রায় সকল পর্যায়ে থেকে বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করার পরও বরাদ্দ পাওয়া বা প্রকল্প অনমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে এই দীর্ঘসূত্রিতা কেন তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

যোগাযোগ সচিব এবং সওজ এর প্রধান প্রকৌশলী ২১ জুন রাঙামাটি সফরকালে সার্কিট হাইজে সাংবাদিকদের বলেছিলেন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সাবলীল করতে খুব দ্রততার সাথে বরাদ্দ প্রদান করা হবে। তারা এও জানিয়েছিলেন বিশেষ অবস্থা এবং বিশেষ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বরাদ্দের প্রয়োজনে ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম পাশ কাটিয়ে বরাদ্দ প্রদান করা হবে। রাঙামাটির জেলাপ্রশাসকসহ উর্ধতন কর্মকর্তারাও সে সময় উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সেই নিয়মের বেড়াজালে আটকে আছে লক্ষ লক্ষ্য মানুষের মুক্তির পথ।

ইতোমধ্যে গত ২৪ জুন টানা বর্ষণে আবারও রাঙামাটি চট্টগ্রাম সড়ক এবং রাঙামাটি খাগড়াছড়ি সড়ক ধসে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। সড়কের ক্ষতগুলো দ্রুততার সাথে সঠিকভাবে পরিচর্যা করা না গেলে আরো বড় ক্ষতির মুখে পড়াটা বিচিত্র নয় বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাঙামাটি সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ভঙ্গুর সড়কসমূহ সরেজমিনে যাচাই করে, গত ১ জুলাই প্রকল্প প্রস্তবনা তৈরী করে সওজ উর্ধতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এই প্রস্তবনায় মোট ১১টি প্যাকেজের আওতায় ১১৪টি পৃথক প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়েছে বলা জানা গেছে। প্রকল্পের সম্ভাব্য বয় ধরা হয়েছে ১৪ কোটি ৪৫ লক্ষ ৬৬ হাজার টাকা। কিন্তু এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশনা এখনও আসেনি বলে জানিয়েছেন সড়ক সংশ্লিষ্টরা।

সওজ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, রাঙামাটি সড়ক বিভাগের অধীনে বর্তমানে ২৪২ কিলোমিটার দূরত্বের সাতটি সড়ক রয়েছে। পাহাড় ধসে এইসব সড়কের ১৪৫টি স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৩৭টি স্থানে সড়ক ধসে গেছে। জাতীয় মহাসড়কটির (রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক) দুটি অংশে সড়কের অস্তিত্বই নেই। এছাড়া কয়েকটি স্থানে পভমেন্ট ও সোল্ডার ধসে পড়েছে (রাস্তার পাশ থেকে মাটি নেমে গেছে)। রাঙামাটি থেকে সাপছড়ি পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার রাস্তায় দেখা গেছে, অন্তত ৪০টি স্থানে সড়কের ওপর পাশের পাহাড় ভেঙে পড়েছে। ২২টি স্থানে প্রধান সড়কটিতে বড় বড় ফাটল রয়েছে। কিছু অংশ পড়েও গেছে।

সড়কের সাপছড়ি এলাকায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া দেড়’শ মিটার সড়ক ধ্বংস হওয়ার মাত্র দুই কিলোমিটার পরেও প্রায় একই চিত্র দেখা যায়। সড়কের এক পাশ নেই। মাটি পড়ে স্তূপ হয়ে রয়েছে সড়কজুড়ে। সেখানে তিনটি বুলডোজার ও একটি এক্সভেটর দিয়ে সড়কের মেরামতকাজ করছিলেন সওজের প্রকৌশলী ও শ্রমিকেরা। অন্তত ১০টি স্থানে ১০০ মিটার করে অংশ মাটি পড়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে আছে বলে তাঁরা জানান।

এদিকে নানিয়ারচর উপজেলার সাথেও লংগদু উপজেলার সড়কটির বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বগাছড়ি-নানিয়ারচর ও লংগদু সড়কটির অন্তত ৫টি স্থানে ৮৫ মিটার রাস্তা ক্ষতি সাধিত হয়ে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের ঘাঘড়া তিনটি স্থানে পাহাড় ধস ও বৃষ্টির পানিতে দেবে গেছে অন্তত আটটি জায়গা।

এছাড়া রানীর হাট-কাউখালীর ৫ কিলোমিটার সড়ক বর্তমানেও পানীর নীচে তলিয়ে রয়েছে। এদিকে রাঙামাটি শহরের প্রায় সবগুলো সড়কই ব্যাপকভাবে ভেঙ্গে গেছে। অভ্যন্তরীন সড়কগুলোর মধ্যে শহীদ মিনার থেকে পর্যটন সড়কের ৬টি স্পটে ২৫০ মিটার সড়ক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। মন্ত্রী পাড়া এলাকায় ৩৫ মিটার সড়ক ভেঙ্গে যাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। রাঙামাটি-কাপ্তাই সড়কের বিলাইছড়ি পাড়া ও বড়াদম এলাকার সড়কটিরও ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে।