পবিত্র শব-ই কদরের গুরত্ব ও তাৎপর্য

237

॥ মাওলানা ক্বারী মুহাম্মদ ওসমান গণী চৌধুরী ॥

কদর শব্দের অর্থ ও নামকরণের কারণ ঃ হযরত আতা (রাঃ) ও হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে কোন তাফসীরকারক কদর এর অর্থ উল্লেখ করেছেন তাকদীর। ভিন্ন অর্থে আয় ব্যয় বা বাজেট। এটা সে রাত্রি সারা বৎসর যা কিছু ঘঠবে এবং তাবদীরে ফয়সালা জারী ও কার্যকর করার উদ্দেশ্য ফেরেশতাদেরকে দিনপঞ্জীতে লিখে সোর্পদ করা হয়। যেমন হযরত আযরাইল (আঃ) কে সারা বৎসরে যে সকল জীবের প্রাণবায়ু নির্গত হবে তাদের তালিকা প্রদান করা হয়।

অর্থাৎ- এ রাত্রিতে প্রত্যেকটি ব্যাপারে অত্যন্ত বিজ্ঞান ও সুদৃঢ় ফয়সালা জারী করা হয়।—(আয়াত ০৫)
তাই ওটাকে লাইলাতুল কদর নামে অভিহিত করা হয়েছে। সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস হযরত ইমাম জুহরী থেকে বর্ণিত-তিঁনি বলেন, কদর শব্দের অর্থ মাহাতœ্য, মর্যাদা ও সম্মান। অর্থাৎ অতীব মাহাতœ্যপূর্ণ রজনী কদর অর্থ মাহাতœ্য ও গুরুত্ব। অর্থাৎ সে রাত্রে যে ইবাদত বন্দেগী করা হয় তার একটা বিশেষ মাহাতœ্য ও গুরুত্ব দেয়া হয়। তাই এটাকে লাইলাতুল কদর নামে অভিহিত করা হয়।

কদর অর্থ ইজ্জত ও মর্যাদা এই রাত্রিটি হলো মহাগ্রন্থ আল-কুরআন অবতরণের রাত্রি। এই কারণে লাইলাতুল কদর অতি গুরুত্বপূর্ণ। কদর অর্থ সংকোচন। অর্থাৎ যার উপর রিযিক সংকোচিত করা গেল। উক্ত রজনীতে এত বেশী ফেরেশতা নাযিল হয় যে, ভূমন্ডলে তিল পরিমাণ জায়গায়ও বাকী থাকে না। অপরদিকে সে রাত্রে ওহীবাহক হযরত জিব্রাইল (আঃ) নেমে আসেন। এই প্রেক্ষিতে ও লাইলাতুল কদর নামকরণ সার্থক হয়েছে।
পবিত্র লাইলাতুল কদর প্রদান করার গুরুত্ব ঃ

লাইলাতুল কদরের বিভিন্ন কারণ রয়েছে- যেমন প্রথমত বিখ্যাত তাফসীরকারক হযরত মুজাহিদ (রাঃ) বলেছেন যে, এক সময় বিশ^ মানবতার অগ্রদূত হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) উপস্থিত সাহাবাগণের সম্মুখে বনী ইসরাইলের শামাউন নামক জনৈক আবেদের ইবাদতের কাহিনী করলেন যে, তিনি হাজার মাস যাবত জিহাদ করেছিলেন। তা শুনে সাহাবাগণ আশ্চয্যান্বিত হয়ে পড়লেন এবং আরজ করলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ (দঃ) আপনার উম্মতগণ ততদিন বাঁচবেনা কেমন করে এত দীর্ঘকালের পূণ্য অর্জন করতে সক্ষম হবে। এই কথা শুনে রাসূল (দঃ) ভাবতে লাগলেন এবং ওহীর অপেক্ষায় থাকলেন। তখন হযরত জিব্রাইল (আঃ) আল্লাহ্র আদেশে সুসংবাদ স্বরূপ সূরা কদর নিয়ে হযরত মুহাম্মদ (দঃ) এর নিকট অবতীর্ণ হলেন এবং বললেন যে, ঐ কদরের মাত্র একটি রজনী উল্লেখিত গাজী শামাউনের এক হাজার মাসের ইবাদতের তুলনায় অধিকতর উত্তম।

লাইলাতুল কদরের কথিত আছে যে, হযরত মুহাম্মদ (দঃ) এর আবির্ভাবের পূর্বে কোন ব্যাক্তিকে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত আবেদ বলা হতো না যতক্ষণ না সে এক হাজার মাস ইবাদত না করতো। এমতাস্থায় সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল (দঃ) এর শ্রেষ্ঠ উম্মতকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদানের উদ্দেশ্য একটি রজনী প্রদান করা গেল। যারা এ রজনীতে জেগে থেকে ইবাদত বন্দেগী করবে তারা শ্রেষ্ঠ আবেদ বলে অগ্রাধিকার পাবেন।

হযরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত- তিঁনি বলেছেন এক সময় করুণায় ছবি রাসূল (দঃ) কে তার সকল উম্মতের আয়ুকালের তারিকা প্রদর্শন করা হলো। তখন উম্মতের আয়ুকালের স্বল্পতা দেখে নবী চিন্তিত যা দীর্ঘায়ু লাভের ফলে পূর্ববর্তী উম্মতগণ লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। হযরত সোলাইমান (আঃ) এর শাসনকাল ছিল পাঁচ শত মাস এবং হযরত জুলকারনাইন এর রাজত্বকালও ছিল

পাঁচ শত মাস সর্বমোট এক হাজার মাস। অবএব যারা রমজান মাসের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে লায়লাতুল কদর লাভ করবে তাদের এক রাত্রির এবাদত এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম হবে।

হযরত আলী (রাঃ) এর পুত্র হযরত হাসান (রাঃ) হতে বর্ণিত যখন হযরত আমিরে মাবিয়ার (রাঃ) অনুকূলে
খেলাফত ত্যাগ করার কারণে তাকে দোয়ারূপ করা হলো তখন তিনি বললেন- আল্লাহ তায়ালা তার নবীকে স্বপ্নে দেখায়েছিলেন যে, উমাইয়া গোত্র তার মিম্বরের উপর বানরের মত লাফিয়ে উঠেছে। এতে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাকে লায়লাতুল কদর দান করলেন এবং এটা তার জন্য তার গোত্রের জন্য এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।

তাই এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, লায়লাতুল কদরের এক রাতের এবাদত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।
তাৎপর্য ঃ
লায়লাতুল কদরকে তিনবার উল্লেখ করার পেছনে রহস্য যে, মহামান্বিত রজনীতে সম্মানিত রাসূল(দঃ) এর উপ মহাগ্রস্থ আল-কুরআন নাযিল করা হয়েছে। আল্লাহর করুনা, দয়া এবং অনুকম্পা এই রজনীতে বেশীর ভাগ নাযিল হয়। তাই এই রজনীকে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তারিখ নির্ধারণ ঃ তারিখ নির্ণয়ে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ তাফসীরকারক মতে রমজান মাসের ২৭শে রাত্রি (২৬ তারিখের দিবাগত রাত) এ অভিমতের পক্ষে তারা নি¤œ লিখিত যুক্তি উপস্থাপন করেছেন-
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন- সূরা কদরে ত্রিশটি পদ রয়েছে। যেহেতু হিয়া পদ দ্বারা যেখানে লাইলাতুল কদরকে বুঝানো হয়েছে সেখানে পর্যন্ত ২৭টি পদ শেষ হয়েছে বিধায় লায়লাতুল কদর ২৭ তারিখে হয়।
তিনি আরো বলেন- লায়লাতুল কদর বাক্যাংশে ৯টি বর্ণ বা অক্ষর আছে এবং এ সূরাটিতে পুনঃ পুনঃ তিরবার বলা হয়েছে। সুতারাং তিন দ্বারা গুন করিলে সাতাশ হবে।

হযরত ওসমান বিল আবিল আছে এক ক্রীতদাস ছিলেন। ক্রীতদাসটি ছিলেন একজন বড় আবেদ। তিনি তার মালিককে সম্বোধন করে বললেন- হে প্রভু! রমজানের কোন একটি রাত্রে সমুদ্রের পানি মিষ্টি হয়ে যায়। তখন তার প্রভু তাকে বললেন- সে রাত্রিটি যখন উপস্থিত হবে তখন আমাকে স্মরণে করে দিও। যখন ঐ রাত্রিটি উপস্থিত হলো তারা তখন গণনা করে দেখলেন ঐ রাত্রিটি রমজান মাসের ২৭ তারিখের রাত্রি।

উক্ত রাতে যা করা হয়েছিল এবং যা হয় ঃ
বেহেশতে বৃক্ষরোপন করা হয়েছে। সমস্ত ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। হযরত আদম (আঃ) সৃষ্টির উপাদান একত্রে করা হয়েছিল। হযরত ঈসা (আঃ) কে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল। বণী ইসরাইলের তাওবা কবুল হয়েছিল। লওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানে বায়তুল ইজ্জত নামের মহামহিম স্থানে একত্রে সম্পূর্ণ আল-কুরআন নাযিল করা হয়। দোয়া কবুল হয়।
কদরের ফজায়েল বা বিশেষত্ব ঃ

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিশ^বাসীকে অসীম রহমত দ্বারা ধন্য করার নিমিত্তে যে পাঁচ মহান রজনীকে বেছে নিয়েছেন তন্মধ্যে অন্যতম হলো লাইলাতুল কদর। সৃষ্টিকূলের জন্য অপরিসীম কল্যাণ। অন্য চারটি রাত্রির অনুপাতে এ পবিত্র রাত্রির বিশেষত্ব খুবই তাৎপর্যবহ। কেননা রাব্বুল আলামীন এ রজনীতে আল-কুরআন মাজিদ নাযিল করেছেন। দয়াময় আল্লাহ এই রাত্রে বান্দার গুনাহ্ ক্ষমা করে জীবনকে সুখময় করার দোয়া দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এই রাত্রে একাগ্রতার সাথে আল্লাহ্র ইবাদত করবে আল্লাহ্ তার সমস্ত জীবনের গুনাহ্ ক্ষমা করে দিবেন। আল-কুরআন মাজিদে বর্ণিত আছে লায়লাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এই মহান রাত্রে উপরোল্লিখিত ফজায়েল ছাড়াও আরো অনেক ফজীলত রয়েছে যেগুলো নি¤œরূপ ঃ

হুজুর (দঃ) এরশাদ করেন যে ব্যক্তি শবে কদরের রাত্রে দু রাকাত নামায পড়বে এবং প্রত্যেক রাকাতে সূরা
ফাতিহার পর সাতবার সূরা ইখলাছ পড়বে এবং নামায শেষে নি¤েœাক্ত দোয়া সত্তরবার পড়বে
আসতাগফিরুল্লাহিল আজিমীল্লাজী লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যূম ওয়াআতব ইলাযহে।

ঐ ব্যক্তি নামাযের স্থান ত্যাগ করা পূর্বে আল্লাহ তায়ালা তার এবং তার পিতা মাতার গুনাহ্ ক্ষমা করে দিবেন এবং ফেরেশতাদেরকে তার জন্য বেহেশতে ফলবৃক্ষ রোপনের নির্দেশ দান করবেন, বিশেষ ঘর নির্মাণ শুরু করবেন, তাহার তৈরির কাজ আরম্ব করবেন।

যে ব্যক্তি ২৭ রমজান চার রাকাত নামায পড়ে (প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা কদর তিনবার ও সূরা ইখলাছ পঞ্চাশ বার এবং নামায শেষে “ছোবহানাল্লাহে ওয়ালাহামদু লিল্লাহে ওয়ালাইলাহা ইল্লাল্লাহু আকবর” পড়বে সে যে প্রার্থনাই করুক না কেন কবুল হবে।

হযরত আলী(রঃ) থেকে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি কদর রাত্রিতে এশার নামাযের পর সাতবার সূরা কদর পড়বে
সে প্রত্যেক কষ্টদায়ক কর্ম থেকে মুক্তি পাবে হাজার ফেরেশতা তার জন্য বেহেশতের মধ্যে দোয়া শুরু করবে।
কদরের রাত্রে যাদের আরাধনা গ্রহণযোগ্য নয়ঃ

যারা নিজে শিরক গুনাহ করে অথবা মুশরিক ও কাফিরদের সাহায্য করে ও তাদের সংস্কৃতি গ্রহণ করে। যার হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর রেসালাতকে অস্বীকার করে ও নবী করিম (দঃ) কে অবমাননা করে অথবা অবমাননাকারীদেরকে সাহায্য করে, তার আদর্শের বিরুদ্ধে লিপ্ত থাকে, আর ঐ সকল ব্যক্তির দোয়াও কবুল হবে না যার কথা আমল কিংবা কাজের মাধ্যমে উক্ত ব্যক্তিদের বিরোধিতা করবে না। আখিরাতের অস্বীকারকারীদের দোয়া কবুল হবে না। যাদের আয় উপার্জন হালাল হবে না। [ লেখক ঃ সভাপতি, জাতীয় ইমাম সমিতি, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা।]