পার্বত্য ভূমি কমিশনে বাঙালি প্রতিনিধি রাখার দাবীতে তিন পার্বত্য জেলায় হরতাল পালিত

286

dr-Hortal photo

স্টাফ রিপোর্টার- ৪ সেপ্টেম্বও ২০১৬, দৈনিক রাঙামাটি: দেশের এক ও অবিচ্ছদ্য অঙ্গ পার্বত্য চট্টগ্রামকে জুমল্যান্ড নামে বিচ্ছিন্নতাবাদের কবল থেকে রক্ষার জন্য ভূমি কমিশনে উপজাতি-বাঙালি সমান সংখ্যক সদস্য অন্তর্ভূক্তির দাবীতে আজ ৪ সেপ্টেম্বর (রবিবার), রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সমঅধিকার আন্দোলনের নেতৃত্বে ৮টি বাঙালি সংগঠনের ডাকে শান্তিপূর্ণ হরতাল পালিত হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলাবাসিকে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে উক্ত হরতাল সফল করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন নেতৃবৃন্দ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ঢাকাসহ তিন পার্বত্য জেলায় ১৯৯৬ সালে খুনী শান্তিবাহিনীর হাতে পাহাড়ে শতাধিক বাঙালি কাঠুরিয়া হত্যাকান্ড স্মরনে “বাঘাইছড়ি ট্র্যাজেডি দিবস পালিত হবে এবং পরবর্তী কর্মসূচী ঘোষনা করা হবে।

আজ ঢাকায় প্রদত্ত সংবাদ মাধ্যমে প্রেরিত এক যুক্ত বিবৃতিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের মহাসচিব মনিরুজ্জামান মনির, শীর্ষ নেতা মোঃ জাহাঙ্গীর কামাল, হাজী ইউনুস কমিশনার, হাফেজ মাষ্টার, এম আনোয়ার, এ কুদ্দুস চেয়ারম্যান, প্রকৌশলী ফেরদৌস মানিক, সমঅধিকার নারী নেত্রী রোজিনা বেগম ও তসলিমা তমা উপরোক্ত ঘোষনা দিয়েছেন। সমঅধিকার আন্দোলন নেতৃবৃন্দ বলেন হরতালের মুখে রোববার সকালে ডাকা ভূমি কমিশনের বৈঠকটি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। যা হরতালের কারণে ব্যর্থ হয়েছে। এটি আন্দোলনকারী ও পার্বত্যবাসী বাঙালিদের আন্দোলনের ফসল এবং প্রাথমিক বিজয় বলে নেতৃবৃন্দ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে রাঙামাটি সার্কিট হাউজের অতিথি কক্ষে সন্তুুলারমা, চাকমা হেডম্যান দেবাশিস রায়, গহর রিজবি গংসহ কতিপয় উপজাতীয় নেতার সাথে বিচারপতি আনোয়ার-উল-হক খোস গল্প ও চা পানে সময় কাটিয়েছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, শনিবার রাতে বৈঠকের জন্য রাঙামাটি সার্কিট হাউজে অবস্থানরত ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার-উল-হক এর সাথে সমঅধিকার আন্দোলন নেতা জাহাঙ্গীর কামাল এর নেতৃত্বে সৌজন্য সাক্ষাতকার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ভূমি কমিশন চেয়ারম্যানের ক্ষমতা হ্রাস এবং কমিশনে বাঙালি সদস্য না রাখার বিষয়টি আলোচিত হয়। তাছাড়া রাঙামাটি জেলার বিদায়ী জেলা প্রশাসক শামসুল আরেফিনের সাথেও সমঅধিকার নেতৃবৃন্দ সাক্ষাত করেন এবং পার্বত্য ভূমি কমিশনে বাঙালি সদস্য না রাখা হলে পার্বত্যবাসী বাঙালিরা ভবিষ্যতে ভূমি ও ভোটের অধিকার হারাবার আশংকাটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দপ্তরে জ্ঞাত করার জন্য জেলা প্রশাসকের নিকট অনুরোধ জানানো হয়।

এখানে স্মরণীয় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের ৯ দফা দাবীনামার মধ্যে ৩নং দফায় বলা আছে- ‘বিতর্কিত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন বাতিল করে তাতে পার্বত্যবাসী বাঙালিসহ সকল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি নিয়ে অথবা পক্ষভূক্ত নয় এমন ব্যক্তিত্বদের নিয়ে কমিশনকে পুনর্গঠন করতে হবে। পার্বত্যবাসী বাঙালিদের নামে বন্দোবস্তি প্রাপ্ত (বা কবুলিয়ত প্রাপ্ত) বৈধ মালিকানাধীন ভূমি ফেরত দিতে হবে। খাস জমি ঢাকার সরকারের নিয়ন্ত্রনে রাখতে হবে। তিন পার্বত্য জেলায় বসতি স্থাপন, জমি ক্রয়-বিক্রয় ও রিজার্ভ ফরেস্ট সরকারী খাস জমি বন্দোবস্তি নেবার অধিকার থেকে দেশের কোন নাগরিককে বঞ্চিত করা যাবে না’।

জেলার অভ্যন্তরীণ নৌ-পথের ৬ টি রুটে কোন নৌযান চলাচল করছে না। শহরের তবলছড়ি, রিজার্ভ বাজার, বনরূপা, কলেজ গেইট এলাকায় সকল দোকান পাট বন্ধ রয়েছে। বাঙ্গালী সংগঠন গুলোর নেতাকর্মীরা রাঙ্গামাটি শহরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে পিকেটিং করছে। তারা রাঙ্গামাটি প্রবেশ মুখ মানিকছড়ি ও কলেজ গেইটে বেশ কয়েকটি গাড়ীকে আটকে দিয়েছে। শহরের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। এছাড়া মোবাইল টিমের মাধ্যমেও শহরে বাড়ানো হয়েছে পুলিশী টহল।

এদিকে আইন সংশোধনের পর আজ পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের প্রথম বৈঠক বসছে রাঙামাটিতে। আজ সকাল ১০টায় রাঙ্গামাটিতে পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের উদ্যোগে রাঙ্গামাটি সার্কিট হাউসে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে ভূমি কমিশনের সকল সদস্যদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর আর্ন্তজাতিক উপদেষ্ঠা গওহর রিজভীসহ সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন বলে সংশ্লিষ্ট্য সূত্রে জানাগেছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ারউল হক। দুই বছর আগে কমিশন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও এটিই হবে তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক।

দু’বছর আগে তিনি বিচারপতি খাদেমুল ইসলামের স্থলাভিষিক্ত হন। কমিশনের আইন অনুযায়ী বিচারপতি খাদেমুল ইসলামের মেয়াদপূর্তির পর নতুন করে কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হলেও আইন সংশোধনীর কাজ চলায় এতদিন কোনো কাজ করেনি নতুন কমিশন। গত ২ আগস্ট পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন সংশোধনী আইনের খসড়া মন্ত্রী পরিষদে নীতিগত অনুমোদনের পর ৯ আগস্ট রাষ্ট্রপতি এ আইনটি অধ্যাদেশ আকারে জারি করেন এবং তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

তবে আইনের বিরোধিতা করে পার্বত্য জেলাসমূহে বাঙালি সংগঠনসমূহ মানববন্ধন, হরতালের মতো কর্মসূচি পালন করে। কিন্তু তাদের সে বিরোধীতার মুখেই কমিশন আইনের অধ্যাদেশ জারি হয়। অধ্যাদেশ জারি করার পর কমিশনের এটি প্রথম উদ্যোগ। এ দিকে সংশোধিত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন বাতিলের দাবিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙ্গালীরা আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। এ অবস্থায় কমিশনের এ সভাকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নানা জল্পনা কল্পনা।

প্রসঙ্গত, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে ১৯৯৯ সালের ৩ জুন গঠিত ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরী কার্যভার গ্রহণের আগেই মারা যান। ২০০০ সালের ৫ এপ্রিল পুণর্গঠিত কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি আবদুল করিম কার্যভার গ্রহনের কিছুদিন পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে পদত্যাগ করেন। ২০০১ সালের ২৯ নভেম্বর তৃতীয় দফায় কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান বিচারপতি মাহমুদুর রহমান ২০০৭ সালে মৃত্যুর পূর্ব তিনি পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস’র) বিরোধিতার মুখে কাজ শুরু করতে পারেননি। জেএসএসের দাবি ছিল আইন সংশোধন।

২০০৯ সালের ১৬ জুলাই বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে তিন বছরের জন্য কমিশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ শুরু করেন। এ সময় তিনি তিন পার্বত্য জেলায় অনেকগুলো মত বিনিময় সভা ছাড়াও কমিশনের বেশ কয়েকটি বৈঠক করেন। এ সময়ই আইন অনুযায়ী খাগড়াছড়িতে সদর দফতর স্থাপন করা হয়। কমিশনে তার মেয়াদ শেষ হয় ২০১২ সালের ১৮ জুলাই। এর পর টানা প্রায় দুই বছর কমিশন শূণ্য ছিল। দুই বছর পর ২০১৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার-উল-হককে কমিশনের ৫ম চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগ দেওয়ার প্রায় ২ বছর পর কমিশনের প্রথম বৈঠক করতে যাচ্ছেন তিনি।

উল্লেখ্য গত ১ আগষ্ট ঢাকায় পার্বত্য ভ’মি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন আইন সংশোধনের বিষয়ে মন্ত্রী সভায় অনুমোদন দেয়ার পর পার্বত্য অঞ্চলের ৫ টি বাঙ্গালী সংগঠন বিক্ষোভ সমাবেশ, মানববন্ধন এবং গত ১০ ও ১১ আগষ্ট ৩৬ ঘন্টা হরতালের ডাক দেয়।

স্থানীয় ৫ টি বাঙ্গালী সংগঠন, পার্বত্য সমঅধিকার আন্দোলন, পার্বত্য নাগরিক পরিষদ, পার্বত্য গণ পরিষদ, পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ ও পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র ঐক্য পরিষদ এ হরতালের ডাক দেয়। একদিকে বাঙ্গালী সংগঠনগুলোর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কর্মসূচীর মাধ্যমে ভূমি কমিশনের বৈঠক ঠেকানোর জন্য হরতাল দিয়ে রাজপথে থাকার ঘোষণা অপরদিকে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর রণপ্রস্তুতিসহ কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূমি কমিশনের বৈঠক অনুষ্ঠানের অনড় অবস্থানের মাধ্যমে আবারো উৎকন্ঠায় পড়েছে পাহাড়বাসী। (প্রেস বিজ্ঞপ্তি)

পোস্ট করেন- শামীমুল আহসান, ঢাকা ব্যুরো প্রধান।