পাহাড়ে খুঁজে ফিরি শান্তি নামের সোনার হরিণ: থামেনি প্রাণঘাতী সংঘাত, খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজী

257

sotu khisha

শামীমুল আহসান : পাহাড়ে এখনো ফেরেনি শান্তি নামের সোনার হরিণ। থামেনী প্রাণঘাতী সংঘাত, খুন, অপহরণ, চাদাবাজীর ঘটনা। এখনো অজানা আতংকে প্রতিনয়ত দিন কাটছে স্থানীয় বাসিন্দারে। কখনও চাঁদার জন্য আবার কখনো আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আধিপত্যের লড়াইয়ে যাচ্ছে তাঁজা প্রাণ। চলমান ঘটনার জন্য জেএসএস প্রতিপক্ষ ইউপিডিএফকে আর ইউপিডিএফ ও সংস্কার গ্রুপ জেএসএসকে দায়ী করেই দায় মুক্ত হওয়ার চেষ্টা লিপ্ত থাকেন। তবে দায়ভার কার ?

জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) কেন্দ্রীয় সহকারী তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা ও ইউপিডিএফ’র প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের নীরন চাকমা দলের পক্ষে এসব হত্যাকান্ডের সাথে তারা জড়িত নয় জানিয়ে বলেন, অভ্যান্তরিন কোন্দলের কারনে ঘটে থাকতে পারে। এভাবেই দায় সারা ভাবেই চলছে পাহাড়ের রাজনীতি। তবে কারা করছে এসব হত্যাকান্ডের ? অপর দিকে শান্তিচুক্তি (পার্বত্য চুক্তি) নামের বেড়া জালে আটকা পড়েছে শান্তির সাদা পায়ড়া। আর নিরাপত্তা বাহিনীর স্বাধীনতা। ১৯৮৭ সালের পর থেকে আঞ্চলিক দলের হত্যাকান্ডের ঘটনায় পাহাড়ে ধারাবাহিক লাশের মিছিল বাড়লেও শান্তি ফিরেনি। চলছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিগুলোর অধিকার আদায়ের লড়াই-সংগ্রাম।

শান্তি চুক্তির ১৮ বছর চলছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ক্ষতায় থাকাকালে পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। কিন্তু আজো পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পার্বত্য জনসংহতি সমিতি (জেএসএস), জেএসএস সংস্কারপন্থী (মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা গ্রুপ) ও ইউনাইটেট পিপলস ডেমক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) সংগঠনগুলোর কর্মকান্ড এখনও পার্বত্য জনপদে সাধারন মানুষের জন্য আতংক। এখনো থেমে থেমে শোনা যায় গুলির শব্দ। ঘটছে সংঘর্ষ,  খুন, অপহরন, চাঁদাবাজি ও গুলি বিনিময়ের ঘটনা। ভূমি বিরোধের জের ধরে একের পর এক খুন হচ্ছে স্থানীয় বাঙ্গালী। উপজাতীয় দুই স্বশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মধ্যে গুলি বিনিময়ের ঘটনায় একাদিক খুনের ঘটনাসহ আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এক গ্রুপ অন্য গ্রুপের কর্মীদের প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে চলেছে।

৯০’র দশকের পর উপজাতিদের জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশই শুধু নয়; নতুন নতুন আঞ্চলিক রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হবার প্রবণতা বেড়েছে। শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ের রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে যেতে শুরু করে। দিন বদলের সাথে সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজতিরা নানা দল উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।

বলা প্রয়োজন- ১৯৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেএসএস প্রতিষ্ঠা লাভ করে। মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা (এমএন লারমা) জেএসএস’র প্রতিষ্টাতা ছিলেন। ১৯৮৩ সালে প্রীতি কুমার চাকমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস’র সশসস্ত্র শাখা শান্তিবাহিনীর একটি দল বিদ্রোহ করে। খাগড়াছড়ির পানছড়িতে প্রীতি গ্রুপের হাতে এমএন লারমা নিহত হন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে প্রীতি গ্রুপের ৫০০০ সদস্য সরকারের নিকট অস্ত্র সমর্পন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। ১৯৯৭ সালে ২ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যদিয়ে জেএসএস ও শান্তিবাহিনীর ১৯৪৭জন সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র-গোলাবারুদসহ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে শান্তিবাহিনীর অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানে প্রকাশ্য ব্যানার প্রদর্শন করে উপজাতীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শান্তিচুক্তিকে আপোষচুক্তি আখ্যায়িত করে এর বিরুদ্ধে  নতুন সংগঠনের জন্ম দেয়। তিন পার্বত্য জেলায় গঠিত হয় শান্তিচুক্তি বিরোধী সংগঠন ইউপিডিএফ। বর্তমান ইউপিডিএফ পার্বত্য চট্টগ্রামের শক্তিশালী আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল।

এদিকে জেএসএস আরেক দফা ভাঙনেরমূখে পড়ে। এমএন লারমার ভাই সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস’র উলে¬যোগ্য একটি অংশ এখন সংস্কারপন্থী জেএসএস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জনশ্রুত আছে, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য সুধাসিন্ধু খীসা-তাতিন্দ্রলাল চাকমা ওরফে মেজর পেলের নেতৃত্বে নব গঠিত জেএসএস’র সাথে ইউপিডিএফ’র গোপন সখ্য গড়ে ওঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ক্রমশ বাড়ছে। যে কারণে উপজাতিরা আঞ্চলিকতার গোন্ডি ছেড়ে জাতীয় রাজনীতির মূলস্রোতধারায় যোগদান করছে। আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রার্থী দিয়ে আসছে।

উপজাতীয় সংগঠনগুলোর মধ্যকার বিরোধ রক্ত ঝরা পাহাড়ের এ দ্বন্ধ কবে বন্ধ হবে তা কেউ যানে না। পার্বত্য জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ’র পাহাড়ের দ্বন্ধ-সংঘাত বন্ধের জন্য ইউপিএফ ২০০০ সাল থেকে সন্তু লারমাকে প্রস্তাব দিয়ে আসছে বলে জানান তারা। তবে এ প্রস্তাব সন্তু লারমার দল মানছে না । গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে সরকার পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে চুক্তির পক্ষ-বিপক্ষে সংগঠনগুলোর।

পার্বত্য এলাকাকে স্বায়ত্ত্বশাসিত এলাকা ঘোষণা ও জাতিসত্ত্বাগুলোকে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবীসহ বিভিন্ন দাবী নিয়ে ইউপিডিএফ’র পক্ষ থেকে সরকারকে চুক্তি বাস্তবায়নে সহযোগীতা করার কথা বলে আসছে। অন্যদিকে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহারসহ নানান দাবী নিয়ে ইউপিডিএফ ভূমি সমস্যার সমাধান, প্রথাগত ভূমি অধিকারের দাবি, পুনর্বাসিত বাঙালিদের সমতলভূমিতে সম্মানজনক পুনর্বাসন করা। এতে পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসবে না বলে দাবী বাঙারি নেতাদের। সন্তু লারমার পূর্ণস্বায়ত্বশাসন, সেনাবাহিনী প্রত্যাহার দাবী মানা হলে হানা-হানী, সংঘর্ষ আরো বৃদ্ধির আশংকা বেশি বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট ব্যাক্তিরা। পার্বত্য অঞ্চলকে নিয়ে একটি গোষ্ঠি ষড়যন্ত্র করছে এবং ঐ চক্রটি পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে সংঘাতের পথ আরো সুগম করে দিতেই চেষ্ঠা চালাচ্ছে বলে বিশিষ্ট ব্যাক্তিরা দাবী করেন।

অন্যদিকে-পার্বত্য অঞ্চলের ভারত, মিয়ানমার (বার্মা) সংলগ্ন ৩৬৫ কিলোমিটার অরক্ষিত সিমান্ত পথ দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারীরা নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে বিরোধ সৃষ্টি করে পার্বত্য সমস্যাকে আরো জটি করে তুলছে। রাঙ্গামাটির আন্ধারমানিক থেকে বান্দরবানের মাদক পর্যন্ত ১৩১ কিলোমিটার মাদক থেকে লেম্বুছড়ি ২১ কিলোমিটার এবং রাঙ্গামাটির থেকে খাগড়াছড়ি ১৩ কিলোমিটার এলাকায় সীমান্ত বাহিনী বা অন্য কোনো বাহিনী নেই। বিস্তীর্ণ এই পাহাড়ি এলাকা আন্তর্জাতিক চক্রের মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের নিরাপদ রুট বা স্বর্গরাজ্য হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব এলাকায় হচ্ছে আফিম, পপি, গাঁজার চাষ।

পার্বত্য মান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক না হওয়ায় পাহাড়ে এখনো সংঘাত চলছে। আর পাহাড়ে সংঘাতের দায় সরকারকে নিতে হবে বলে উপজাতীয় নেতৃবৃন্দরা মনে করেন।

পাহাড়ে গত কয়েক বছরের চলমান ঘটনার চিত্র: খাগড়াছড়ির পানছড়িতে আ’লীগ নেতাকে গুলি করে হত্যা, রাঙ্গামাটির রাজস্থলীতে উপজেলা আ’লীগের সহসভাপতি মংক্য মারমা হত্যাকান্ড, রাঙ্গামাটির আলোচিত অনীল তঞ্চঙ্গা, বাঘাইছড়িতে আঞ্চলিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইছড়ির শিজক এলাকায় জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) দুই নেতাসহ তিনজনকে গুলি করে হত্যা। গুইমারার বুদুংপাড়ায় সম্প্রতি প্রকাশ্যে চাঁদার দাবীতে জীপচালক ও আওয়ামীলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলমসহ ২ ব্যাক্তি অপহরনের ঘটনাও সকলেন অজানা নয়।

পোস্ট করেন- শামীমুল আহসান
ঢাকা ব্যুরো অফিস, ১৩ জুলাই ২০১৬, দৈনিক রাঙামাটি