পুরনো নেতৃত্বের প্রতিই আস্থা রাখলেন নেতাকর্মীরা ॥ দীপংকর মুছা স্বপদে বহাল

307

॥ স্টাফ রিপোর্টার ॥
পুরনো নেতৃত্বের প্রতিই আস্থা রাখলেন নেতাকর্মীরা। রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক কাউন্সিলে আবারও সভাপতি দায়িত্ব পেয়েছেন খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি দীপংকর তালুকদার এমপি। এদিকে সরাসরি ভোটেও সাধারণ সম্পাদক পদে পুণঃনির্বাচিত হয়েছেন হাজি মুছা মাতব্বর।

এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পাহাড়ের দাদা খ্যাত দীপংকর তালুকদার এমপি’র দলীয় জেলা কমান্ডে গত ২৬ বছরের কর্তৃত্ব বহাল থাকলো। আর দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হাজি মুছা মাতব্বর তার পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন টানা ৮ বছর। কাউন্সিল ঘিরে নানা গুঞ্জন এবং নেতৃত্ব পরিবর্তন বিষয়ে হাজারো বর্ণনার সমাপ্তি হলো এর মধ্য দিয়ে। সৃষ্টি হলো দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এবং প্রতিষ্ঠিত হলো শ্রদ্ধার নিদর্শন।

রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি পদে দীর্ঘ ২৬ বছর পর এবারই প্রথম দীর্পকর তালুকদার প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। সব দলেই এমনটাই ঘটে থাকে যে, যখন কোনো প্রবীণ নেতা নিজ পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হন; তখন দেখা যায় রশির অন্য মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা লড়াকু তারই একসময়ের শীষ্য বা সহযোগী। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

দীপংকর তালুকদারের বিপরীতে যিনি সভাপতি পদের দাবি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন তিনিও দীপংকর তালুকদারেরই হাতে গড়া সৈনিক এবং তার ভাবশীষ্য পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা। শেষ পর্যন্ত কাউন্সিলের প্রথম অধিবেশনের পর দাদা’র প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। এতে কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যস্থতা যেমন ছিল, ছিল দলের প্রতিও নিখিল কুমারের আনুগত্য এবং স্বদিচ্ছা।

এর মধ্য দিয়ে দলেও একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সমাপ্তি ঘটলো। অনেকেই উভয় প্রার্থীর বিষয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নিলেও দলীয় নেতাকর্মীদের বেশিরভাগই অস্বস্তির মধ্যে ছিলেন। তারা ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ দশায় হাসফাস করছিলেন। তারা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাউন্সিলের একজন সদস্য ও প্রবীণ সারীর নেতা ফলাফলের পরে মন্তব্য করেছেন, কাউন্সিলর ও অন্যান্য নেতারা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়লেও শেষ অবদি তারা শান্ত ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। এখন নেতাদের সব ভুলে নতুন করে শুরু করার উদারতা দেকানোর সময়। কে কাকে সমর্থন করেছে, এই বিবেচনা বিজয়ী বিজিত কারোই মনে রাখা ঠিক হবে না। সবাই আমাদের দলের মানুষ। এই নেতারাই তাদের নেতা। অনেকদিন পর কাউন্সিল আসে, তখন কিছুটা নড়াচড়া দলকে বরং আরো চাঙ্গা করে।

সর্বশেষ ২০১৪ সালে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল ২০১৯ সালের ২৫ নভেম্বর। কিন্তু নির্ধারিত দিনের মাত্র ৫দিন আগে অনিবার্য কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়। করোনা মহামারির কারণে আর তা হতে পারেনি তাই এই সম্মেলনটি একটি বহুল প্রতীক্ষিত সম্মেলন ছিল।

প্রথম অধিবেশনের পর দলের বর্তমান সহ-সভাপতি নিখিল কুমার চাকমা সভাপতি পদে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা প্রত্যাহার করে সরে আসায় শুধুমাত্র সাধারণ সম্পাদক পদে সরাসরি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বরাবরের মতো রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে এবারও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি স্পষ্টভাবেই দৃশ্যমান ছিল। অতীতে সকল কাউন্সিলেই এই পদটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে আসছে। এবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন আগের কাউন্সিলের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হাজী মোঃ মুছা মাতব্বর এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাজী কামাল উদ্দিন। কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে মুছা মাতব্বর পান ১৩৮ ভোট, কামাল উদ্দীন পান ১০২ ভোট।

সভাপতি খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি দীপংকর তালুকদার এমপি একজন সাবেক প্রতিমন্ত্রী। ছাত্র জীবন থেকেই তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রাজনিতিক। বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর তিনি ভারতে নির্বাসিত জীবন যাপন করেন। পরে আশির দশকের মাঝামাঝিতে দেশে ফিরে দল পুণর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এর মাঝেই ১৯৯১ সালে তিনি প্রথম সংসদ সদস্য হন এবং রেশ ধরে চারবার এমপি নির্বাচিত হন তিনি। এমপি থাকা অবস্থায়ই ১৯৯৬ সালের সম্মেলনে তিনি প্রথমবারের মতো জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর ২০০২ সাল এবং ২০১২ সালে দুবার  সম্মেলন হলেও সভাপতি পদে তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল না।

সাধারণ সম্পাদক হাজী মুছা মাতব্বর, তাকে নির্বচিত করায় কাউন্সিলরদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছেন, আমি চেষ্টা করবো এই আস্থার সম্মান রাখতে। তিনি বলেন, দলে গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবেই নির্বাচন, নির্বাচন চলে গেছে এখন আমরা সবাই এক।

এর আগে কাউন্সিল ঘিরে দেওয়া তার বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে আমার পরিবারের অবদান কারো অজানা নেই। পারিবারিক ঐতিহ্যের রেশ ধরেই আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতির সাথে ছাত্র জীবন থেকে যুক্ত। আমার এলাকার জনগণ এবং দলীয় নেতাকর্মীরা মানুষ হিসেবে আমার গ্রহণযোগ্যতাকে মূল্যায়ন করে বলেই প্রথমবার নির্বাচনে অবতীর্ণ হওয়ার সাথে সাথে আমাকে বিপুল ভোটে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে। পরে দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রার্থী হলে সেখানেও তারা আমাকে জয় দিয়ে পুরস্কৃত করে। পাহাড়ের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন করার ক্ষেত্রে আমি কখনও কারো রক্তচক্ষু দেখে পিছপা হইনি। আমার বিশ্বাস, কাউন্সিলররা অবশ্যই এসব মূল্যায়ন করবেন। তার এই বক্তব্যেরই প্রতিচ্ছবি প্রকাশ পেয়েছে নির্বাচনে।

মঙ্গলবার (২৪ মে) বিকেলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইনস্টিটিউট অডিটোরিয়ামে কাউন্সিল ও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলের প্রথম অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
নির্বাচন পরিচালনা করেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।

মঙ্গলবার সকালে শুরু হয় উদ্বোধনী অধিবেশন। সেই অধিবেশন শেষে বিকেল ৩টায় শুরু হয় দ্বিতীয় অধিবেশন তথা কাউন্সিল। জেলা আওয়ামী লীগের এবারের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে উদ্বোধক ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রকৌশলী মোশাররফ হোসেন। প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।