আনোয়ার আল হক- ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, দৈনিক রাঙামাটি : আমরা এখন ঘটা করে অনেকগুলো দিবস পালন করি; আর এটা বিশ্বজুড়েই পালিত হয়। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক দিবস মিলিয়ে শতাধিক দিবস পালন করা হয়। অনেকের মতে, এখন বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে বেশিরভাগ দিনই কোনো কোনো বিষয়ের জন্য বিশেষ দিবস পালন করা হচ্ছে। দিবসগুলো পালনে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো স্বার্থকতা রয়েছে। তা নাহলে বিশ্বময় বসে থাকা এতো দার্শনিক, পন্ডিত আর বোদ্ধারা এসব দিবস পালনের জন্য এতো উৎসাহিত করতেন না। জাতিসংঘ ঘোষিত দিবসগুলো পালনের ক্ষেত্রে তো সদস্য দেশগুলোর জন্য বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। বিশ্ব কন্যা দিবস, বাবা দিবস, মা দিবস, প্রবীণ দিবস, পরিবেশ দিবস, বিশ্ব হাতধোয়া দিবস.. এভাবে নানানামে নানা বিষয়ে দিবস পালনের এই যে বৈশ্বিক প্রবণতা একে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই।
কেউ কেউ না চাইলেও সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামানুসারে প্রবর্তিত বিশ্ব ভালোবাসা দিবসটিও এখন বিশ্বময় কমবেশী সর্বব্যাপী পালিত হচ্ছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেন ভালোবাসার আবার দিবস কি? ভালোবাসা প্রতিমূহুর্তের, সব সময়ের। কথাটা আমার মতে একেবারেই অবান্তর। কারণ হাত আমরা সবসময় ধুই, পরিবেশের জন্য কাজ করি প্রতি মূহুর্তে, বাবা চিরকাল বাবাই, মায়ের স্থান কেউ দখল করতে পারে না। তারপরও তাদের ঘিরে যে দিবস আমরা পালন করি, তারতো নিশ্চয়ই একটা স্বার্থকতা আছে। সারাদিনের ক্লান্তিশেষে মানুষ তার কুলায় ফিরে যায়, সেখানে তার পথ চেয়ে বসে থাকেন একজন মমতাময়ী মহিয়সী নারী, থাকে বাবা-মা ভাই-বোন সন্তান-সন্ততি। তবে সেই মহিয়সী নারী কখনও স্ত্রী, কখনও মা কখনও বা বোন। বয়স, পরিবেশ ও ভাগ্য অনুযায়ী একেকজনের জন্য এক একজন মহীয়সী বসে থাকেন আঁজলা ভরে ভালোবাসার পরশ নিয়ে। যার সান্নিধ্যে ক্লান্তি ধুয়ে মুছে মানুষ আবার আর একটি দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। কর্মজীবী নারীরা সারাদিন ব্যস্ততাশেষে ঘরে ফিরে যান, তার অপেক্ষায়ও থাকে উপরে বর্ণিত সবাই। কিন্তু তার পরও ক্ষণকাল পরেই তিনি আবার হয়ে উঠেন সবার অপেক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের সমাজে এই মাতৃতান্ত্রিক আবর্তন বিশ্বব্যপী আবর্তিতত হচ্ছে সেই আবহমান কাল থেকেই। এর কেন্দ্রবিন্দুটি কিন্তু ভালোবাসা। একটি বাংলা প্রবাদ শুনে আসছি ছোটকাল থেকে ‘প্রেমের পবিত্র শিখা চিরদিন জ্বলে স্বর্গ থেকে আসে প্রেম স্বর্গে যায় চলে। সবার মনেই প্রেম থাকে, থাকে ভালোবাসা; তবে বলতে আপত্তি কোথায়?
ভালোবাসা শুধু পবিত্রই নয় পূর্ণময়ও বটে, নির্দোষ ও পরিশিলিত ভালোবাসা আমাদের ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির পথ মসৃণ করে। সৃষ্টজীবের প্রতি বিশেষ এবং পিতা-মাতা ও রাসুলের প্রতি সবিশেষ ভালোবাসা ছাড়া ঈমান পরিপূর্ণতা পায় না। আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি ঘোষিতভাবে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইনস ডে। ভালোবাসার জন্য আলাদা একটি দিন। প্রতিদিনের মত আজকের প্রভাতেও সূর্য পূব আকাশে রাঙা চোখ মেলবে। দক্ষিণা হাওয়া হৃদয়ে বুনে দেবে মায়াবী শিহরণ। প্রকৃতিতে খেলা করবে বর্ণিল প্রজাপতি ও ভ্রমরের ঝাঁক। শুরু হবে আরো একটি নতুন দিন, যে দিনটির নাম দেওয়া হয়েছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস।
আজকের রৌদ্রজ্জ্বল শুভ্র সকাল, রূপালী দুপুর, আর মায়াবী রাত ; পুরো সময়টাই কেবল ভালোবাসার ক্ষণ। ভালোবাসার রঙে রঙিন হবে হৃদয়। বসন্ত বাতাসে হৃদযন্ত্রের মিথস্ক্রিয়ায় সারা বিশ্বের প্রেমপিয়সী মানুষ বছরের এ দিনটিকে বেছে নিবে মনের গহিনের কথকতার কলি ফোটাতে। করতালে সুরে সুরে আজ ভালোবাসার গান গাইবার দিন। ‘ভালোবাসা’ এই কথাটা নিয়ে পৃথিবীতে যত গল্প, কবিতা, গান, উপন্যাস রচিত হয়েছে আর কোনো সম্পর্ক নিয়ে ততটা হয়নি। তবে ভালোবাসা হবে সবার জন্য, মানুষ ও মানববতার জন্য, প্রিয় আর প্রেয়সির জন্য, বন্ধু আর শুভার্থীদের জন্য। বিপদগ্রস্থ আর পিড়ীতদের জন্য আর নিজের পছন্দের মানুষ; সে যেই হোক পুরুষ কিংবা নারী সকলের জন্য, নির্মল নিষ্কলুস আর পবিত্র ভালোবাসা। এই দিনে অনেকেই অনেক কিছু স্বপ্ন দেখে যেমনঃ অনেকে ভাবে তার প্রিয় বন্ধুকে নিয়ে ঘোরাফেরা করবে, আবার অনেকে ভাবে তার বন্ধুকে নিয়ে পার্কে যাবে, আবার অনেকে ভাবে তার মা-বাবা-ভাই-বোনদের সাথে গল্প করবে। আসলে আমাদের যেটা করনীয়ঃ অনেকেই আছেন সারাদিন কাজ কর্ম করে বাসায় যখন ফিরেন তখন তার মা-বাবার সাথে সময় দিতে পারেন না, তাই এই দিনটিকে পরিশীলিত ভালোবাসার জন্য নির্দিষ্ট করতে কোনো সমস্যা তো নেই। গতিময় জীবনের অফুরন্ত ব্যস্ততার ফাঁকে নিজের কাছে মানুষ, ভালোবাসার মানুষগুলোকে যদি একটু বাড়তি সময় দেওয়া যায় মন্দ কি? আমি বলি ভালোবাসা দিবসে যদি আমাদের মা-বাবা-ভাই-বোনদেরকে নিয়ে একসাথে বাসায় বসে গল্প করি, তাদের মনের কথাগুলো শুনি, যে গুলো তারা আমাকে সময়ের কারণে বলতে পারেনি। তাদেরকে একটু ভালবাসা দেওয়ার চেষ্টা করি, মা-বাবার ছেলে হিসেবে, ভাই-বোনদের ভাই হিসেবে; সবাই যদি এই কাজটা করি, তবে জীবনের যান্ত্রিকতার মাঝেই তৈরি হবে আরো কিছু স্মরণীয় সময়। আমি যদি আজকে এই রকম একটা ভাল কাজ করি, হয়তো আমার ছেলেও আমার জন্য এমন একটা কাজ করবে। আপনি যদি আপনার মা-বাবাকে একটু সময় দেন একটু ভালবাসা দেন, আপনার ছেলে আপনার কাছ থেকে তা শিখে আপনাকেও ততটুকু সম্মান দিবে। আপনি আপনার মা-বাবাকে ভালবাসুন এবং আপনার ছেলেকেও তা শিখাবার চেষ্টা করুন।
শ্বাশ্বত ইসলাম মানুষকে শিক্ষা দেয় প্রথমত তার নিজেকে ভালোবাসাতে হবে, নিজ শরির ঠিক রাখার জন্য নিজের স্বাস্থ্যের যতœ নেওয়া একটি ওয়াজিব কাজ। শুধু নিজেকেই নয়, ইসলাম পিতা-মাতা, ভাইবোন, সন্তান সন্ততি এমনকি প্রতিবেশীকে ভালোবাসার শিক্ষা দেয়। একে অন্যকে ভালোবাসার এই অবিনাশি চেতনাই ইসলামকে বিশ্বের মানুষের কাছে এতটা জনপ্রিয় করেছে। রাসুল (দঃ) বলেন, ‘তোমার ভাইকে সাহায্য করো চাই সে অত্যাচারী হোক কিংবা অত্যচারিত হোক। সাহাবায়ে কেরাম বললেন আমরা অত্যচারীকে কিভাবে ভালোবাসবো? তিনি বললেন, তুমি জুলুম থেকে তার হাত টেনে ধরবে’ (বুখারী ২৪৪৪ ভাবানুবাদ)। অপরের প্রতি দয়া ও সহযোগীতার হাত সেই বাড়িয়ে দিতে পারে, সতত যার মন ভালোবাসায় টইটুম্বুর থাকে। সুতরাং ভালোবাসা কোনো পঙ্কিল শব্দ নয়, নয় নর্দমা থেকে উঠে আসা কোনো বস্তপঁচা বর্ণগুচ্ছ। ভালোবাসা এক পূর্ণময় ইবাদতের নাম। ভালোবাসতে হবে প্রত্যেক সৃষ্টজীবকে প্রতি মূহুর্তে।
তবে মনে রাখতে হবে, এসব দিবস পালনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো কোনো পক্ষের অতি বাড়াবাড়ি, দিবস পালনের উদ্দেশ্যই মাটি করে দেয়। তেমনটি যাতে না হয়, সেদিকে সবাইকে সবিশেষ নজর রাখতে হবে। পবিত্র এই শব্দ যাতে আমাদের বাড়াবাড়িতে পঙ্কিলময় না হয় সে ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে। স-বা-র জন্য রইল ভালোবাসা।
গল্প… ভালোলাগার শক্ত হাত :
মোঃ হান্নান- শাওনের জীবন থেকে ভালোলাগাগুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছে। সেগুলো বিদায় নিয়ে জমা হচ্ছে পিছুটানের খাতায়। একেক বয়সে ভালোলাগাগুলোর চরিত্রও ভিন্নরকম। কোন না কোন সময় কাউকে না কাউকে সম্পুর্ন নিজের মত করে ভালো বেসেছিল। সে ভালোবাসার মানুষগুলো কেউ আছে, কেউ নেই। যারা আছে তাদের কেউ দুরে থাকতে ভালোবাসে, আর যারা কাছে আছে তারা রক্তের বাঁধনে আবদ্ধ আছে বলেই আছে। যারা নেই তারা একেবারেই নেই। ভালোলাগাটা একধরনের বাতিক। শাওন পিছুটানে চোখ রাখে। জন্মের পরপরই সমস্ত ভালোবাসায় বসত গেড়ে নিল মা আর বাবা। রক্তের বাধনে যে এত মমতা, এত ¯েœহ, এত ভালোবাসা তাতো পৃথিবীর সবকিছুর উর্ধ্বে থাকা চাই। মা আর বাবার সে মমতায় কোন কৃত্রিমতা নেই, অকৃত্রিমতা ছাড়া।
ত্রিশ পেরিয়ে আসা শাওন এক টগবগে তরুণ। কাটিয়ে আসা এতটা বসন্তে কতরকমের ভালবাসার পরশ পেয়েছে শাওন তার ইয়ত্তা নেই। পুর্ণতা আর অপুর্ণতা, প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তিতে ভালোও না, মন্দও না। শাওন মুহুর্তের জন্য অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ল এ মুহর্তে। অতীত ভাবনার মায়াজালে জড়িয়ে পড়ল হঠাৎ করে। ফেলে আসা জীবনের হিসাব নিকাশে আপ্লুত আবেগে বন্দি হয়ে পড়ল সে। উদ্বেগ-উৎকন্ঠা, আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখের চাদরে জড়িয়ে থাকা দিনগুলো সত্যিই অতুলনীয় ও অকল্পনীয়। টুপ টুপ করে কয়েক ফোঁটা চোখের জল পড়ল শাওনকে অবাক করে দিয়ে। এ চোখের জলের মানেটা কি? এত ভালোবাসার মাঝে বেড়ে উঠা শাওনের চোখে জল এল কেন? তবে কি তার সে ভালবাসার অধ্যায়গুলো অপুর্ণই রয়ে গেল। চোখের জল তো দু’ধরনের হয়ে থাকে। কষ্ট আর আনন্দের। এই মূহুর্তে কোনটার জল গড়িয়ে পড়ল চোখ থেকে, বুঝল না সে।
সুপ্তির সাথে শাওনের পরিচয় কিশোর বয়সে। তার মনটা যখন কৈশোরের আনন্দে উদ্বেলিত, রঙ্গীন মেঘে উড়ে চলার বয়স, তখনই ভালো লেগে গেলো সুপ্তিকে। অবশ্য এ ভালোলাগার পেছনে শাওনের প্রতি সুপ্তির অনধিকার চর্চাগুলোই বেশি ধরা পড়ে। শাওনকে নিজের মত করে গড়ে তোলা; সব সময় পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ করা; চমৎকার ভবিষ্যতের প্রত্যয়ে সুখমেশানো দেখানো স্বপ্নগুলো শাওনকে ক্রমশই দুর্বল করে ফেলে সুপ্তিকে ভালোবাসার জন্য। জীবনের প্রথম ভালোবাসার কেতন উড়া শুরু এ সুপ্তির চোখে চোখ রেখে। দুজনার দেখাশুনা, গল্পে মেতে উঠা ক্ষনগুলোর হাত ধরে কখন কিভাবে সুপ্তিকে নিজের মনের গভীরে জায়গা করে দিল তা শাওন নিজেই জানে না হয়তো। শাওন নিজে নিজেই হাসে। সুপ্তি আসলেই ভালোলাগার মত মেয়ে। সুপ্তির সাথে দিনগুলোর তুলনা চলে না। এক কথায় চমৎকার।
হঠাৎ করে ফোনটা বেজে উঠল। হাত বাড়িয়ে রিসিভারটা নিল, হ্যালো বলতেই ওপ্রান্ত থেকে পরিচিত কেউ বলে উঠল, কি করছো? শাওন উত্তর দেয়, নিজস্ব কিছু কাজে ব্যস্ত আছি, বিকালে দেখা হবে। অপরপ্রান্তে টেলিফান রাখার শব্দ শোনা গেল। শাওন আবারো ভাবনার জগতে হারিয়ে গেল। সুপ্তির সাথে ইদানিং দেখাও হয় না, কথাও না। একসময় একজন আরেকজনকে না দেখলে দিনটা ভালো যেত না। আর এখন দুজনার সম্পুর্ন নিজস্ব পরিবেশে বেশ ভালই কাটছে চলমান দিনগুলো। মনে পড়ে সেই দিনটির কথা। গ্রীষ্মের প্রচন্ড খরতাপের ঠিক দুপুর বেলা। সেই বয়োবৃদ্ধ গাছটার নিচে শাওন ছিল সুপ্তির সাথে। সুপ্তি কোনরকম ভুমিকা ছাড়াই বলে বসলো, অসম্ভব। শাওন জানতে চাইল, অসম্ভব মানে? সুপ্তি বুঝাতে চেষ্টা করে, শাওন তুমি এখনও অপ্রতিষ্ঠিত। প্রতিষ্টিত হতে হতে ততদিনে আমি….। সুপ্তির এই উক্তি এক অপ্রত্যাশিত ঝড় হয়ে তছনছ করে গেল শাওনের সাজানো বাগান এবং স্বপ্নগুলো।
ভালো লাগাগুলো এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে এক এক করে। হটাৎ করেই এমন ভর দুপুরে সারা আকাশ আধাঁর ছেয়ে বৃষ্টি নামল। বৃষ্টির মাত্রা এত বেশি যে, দুরের সবকিছু অস্পষ্ট হয়ে গেল। শাওন কান পাতে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে। বেশ ভালোও লাগে তার। বৃষ্টির একটা চরিত্র বেশ পছন্দ শাওনের। ধুলোয় জমে থাকা সবকিছু পরিষ্কার করে দিয়ে তবেই ক্ষান্ত হয়। সবকিছুকে চকচকে করে নতুনত্ব উপহার দিয়ে তবে বৃষ্টি বিদায় নেয়। তাই তো শাওনের বৃষ্টি এত পছন্দের। শাওন ভাবে, তার মনে জমা থাকা অতীতের সবধুলো ময়লা যদি এভাবে ধুয়ে ফেলা যেত।
আবারো ফোনটা বেজে উঠে, আবারো রিসিভার হাতে নিয়ে হ্যালো বলতেই শুনতে পেল, কি করছো এখন? শাওন উত্তর দেয়, বিশ্রাম। অপরপ্রান্তে থেকে জানতে চাইল, দুপুরের খাবার খাচ্ছো কোথায়? শাওন জানালা দিয়ে বৃষ্টি কমে এল কিনা দেখার জন্য চোখ রাখে। বৃষ্টি কমে আসার কোন আভাষ পাচ্ছে না দেখে বলল, দুপুরে অফ। অপরপ্রান্ত থেকে কেন জানতে চাইলে, শাওন বলে, ইচ্ছে নেই। রিসিভার রাখার আগে শাওন অপরপ্রান্ত থেকে ক্ষোভ মেশানো গলা শুনতে পেল, যা ইচ্ছে হয় তাই করো। খুব জোরে রিসিভার রাখার শব্দটা কানে তালা মেরে দিল।
শাওন জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। বাইরে অবিরত বৃষ্টি হচ্ছে। আজ সুপ্তিকে এত বেশি মনে পড়ছে কেন? তার সাথে তো কোন সম্পর্কই তো তৈরি করতে পারেনি। একটা সময় ব্যাকগ্রাউন্ড নড়বড়ে ছিল বলে সুপ্তি শুধুমাত্র সে অযুহাতে দুরে সরে রইল। সুপ্তির ভালবাসায় মনের প্রাধান্য ছিলনা। সুপ্তি শাওনকে স্বপ্ন দেখিয়ে সময়কে নিজের নিঃসঙ্গতাকে ব্যস্ত রেখেছে মাত্র। মনে পড়ে শাওনের, কি বলেছিল শেষ দেখায়। শাওন বলেছিল, যে স্বপ্ন দেখায় সে ভালোবাসার স্বপ্নও দেখায়। তবুও সুপ্তির টনক নাড়তে পারেনি শাওন। সেই শেষ কথা। এখন দেখাও হয় না, কথাও হয় না। শাওন জেনেছে এখনো সুপ্তি বিয়েই করেনি। কারও অপেক্ষায় রয়ে গেছে। শাওন ভাবে, যার অপেক্ষায় আছে অন্ততঃ সে নয়। অন্য কেউ। যার ব্যাকগ্রাউন্ড খুব শক্ত। খুউব। আচ্ছা, সে তো এখন প্রতিষ্টিত এক সরকারী কর্মকর্তা। বড় পদের বড় বেতনের চাকরী। গাড়ী, বাড়ী, ব্যাংক ব্যালেন্স সবই এখন হাতের মুঠোয়। তবুও কি সুপ্তির যোগ্যতায় পৌছানো হল না? তা ভাবতেই কিঞ্চিৎ কষ্ট পেলেও আহত হয় না সে। তার হিসাবে সে এখন পরিপূর্ণ একজন মানুষ। যা পেয়েছে তার প্রাপ্য বলে পেয়েছে। সে এতেই সস্তুষ্ট। তবে সুপ্তির কথা চলে আসলেই কিছুটা হলেও খারাপ লাগে। একসময়ের ভালোলাগা এখন দিনে দিনে করুনাতে পরিনত হচ্ছে। সুপ্তির প্রতি কখনো শাওনের ক্ষোভ জন্মায়নি। ভালোলাগাটা রুপ পরিবর্তন করে করুনাতে স্থান নিয়েছে।
টেলিফোনটা কাছে টেনে নিল। রিং করলো। রিসিভ করলো কেউ যেন। হ্যালো বলতেই শাওন বুঝে নিল কে রিসিভ করেছে, কাল আমরা বাইরে যাচ্ছি। ওপ্রান্ত থেকে প্রশ্ন করলো, কোথায়? শাওন বলে, দুরে কোথাও যেখানে শুধু এক পশলা বৃষ্টি হয়, এক চিলতে রোদ উঠে পরক্ষনেই আবার এক গুচ্ছ মেঘ এসে যাবে মুহুর্তেই। ওপ্রান্ত থেকে সুর মেলায়, পাহাড়গুলো দুর্গ হয়ে ছোট এক শহরকে পাহাড়া দিচ্ছে, স্বচ্ছ নদীর কলতানে মুখরিত সহজ সরল জীবন যাপন যেখানে। শাওন বলে, যাবে তুমি সে চমৎকার শহরে? কবিতার সুরে বলে উঠে ওপ্রান্তে, মন তো আর মানে না অপেক্ষার, আমি ছুটে যেতে যাই এখনি সেখানে, অনিন্দ সুন্দর যে শহর চমৎকার আর চমৎকার। পরক্ষনেই সে আবার বলে উঠে, ফিরবো নাকি? শাওন বলে, ফিরে কি আসা যায় এমন শহরকে পিছনে রেখে? আচ্ছা রাখি। দুপ্রান্তে দু’জনেই ফোন রেখে দেয়।
দীর্ঘসময়ের ব্যস্ততা শেষে বৃষ্টি থামল শেষ বিকালে। শাওন অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা ফ্ল্যাটে চলে এল। আসার পথে পথের পাশে ফুল দোকান থেকে অনেকগুলো ফুল কিনে নিল। নিজের ফ্ল্যাটের কলিং বেল টিপতেই দরজা খুলে গেল মিনিট খানেক অপেক্ষা করে। দরজা খুলে দেয় নদী। ফুলগুলো নদীর সামনে এগিয়ে ধরে বলে, হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন নদী। চমৎকার এক হাসি উপহার দিয়ে ফুলগুলো হাতে নিয়ে সেও বলে, সেম টু ইউ। পরক্ষনেই এক কৃত্রিম অভিমান চোখে মুখে নিয়ে এসে বলে সে, নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়ে ভ্যালেন্টাইন পালন করা হচ্ছে, তাই না?
এজন্যই নদীকে বেশ ভালো লাগে। ঠিক সুপ্তির মতই নদীর আচার আচরন তবে তফাৎটা দুজনার মাঝে কৃত্রিম আর অকৃত্রিম। সুপ্তির সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে যখন শাওনের মনে হল চারিধার শূণ্য আর হতাশায় অগোছালো আর তছনছ। কৈশোরে সেই দুরন্ত কিশোরের আর কোন অধিকার নেই স্বপ্ন দেখার। স্বপ্নহীন শাওন যখন কষ্ট নামক দুকুল ভাঙ্গা নদীতে সাতরিয়ে চলেছে, জীবন-মৃত্যূর মাঝামাঝি যখন তার ভবিষ্যৎ, যখন সে ভাবল জীবনের সবটাই অর্থহীন, যখন ভাবতে শুরু করলো একজনকে তো ভালোবেসে শুন্যহাতে ফিরে আর কার মাঝে নিজেকে খুঁেজ দেখবে, তখনই মাঝ নদীতে ভেলা হিসেবে কেউ এল একগুচ্ছ স্বপ্ন নিয়ে, এক নতুন জীবনের পরিপূর্নতা দিতে। সে তো হতাশাচ্ছান্ন অন্ধকার রাতের শেষে নব জীবনের সুর্যদয় ঘটাল। শাওন তাকে ঘিরে আস্থা ফিরে পেল। ভেঙ্গে যাওয়া স্বপ্নগুলো ফিরে পাওয়ার আশ্বাসে উদ্বেলিত হয়ে উঠল মনটা। সে আর কেউ নয়, নদীই। সেই নদীই সারাক্ষনই উদ্বেলিত আর উৎকন্ঠায় থাকে শাওনকে নিয়ে। এই নদীই তো রোজ অনেকগুলো ফোন করে শাওনকে। শাওনের বিষন্নতায় একরাশ ভালোবাসার বারোতা বইয়ে দেয় সে প্রতিনিয়ত। নদী চায় শাওন যেন কোন অবস্থায় একাকীত্ব অনুভব না করে।
দু’জনার সর্ম্পকটা শুরুতে ভালোলাগা দিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হলো ভালোবাসার অধিকারে। দুজনেই ভালোবাসার দিনে পৃথিবীর সব ভালোবাসাকে স্বাক্ষী রেখে একে অপরের হাতে হাত রেখে বিয়ের পিড়িতে বসলো। শাওনের সব ভালোবাসায় বসত গেড়ে বসল নদীর ভালোবাসা। আজ শাওন আর নদী দুজনেই পরিপূর্ন। আজ সেই দিন। দুজনার ষষ্ট বিবাহ বার্ষিকী। এমন দিনে সুপ্তিকে মনে পড়ার মানেটা কি? হাজারো প্রশ্ন মনের মাঝে এসে ভিড় জমালেও একটাই উত্তর ঝলমল করছে মনের আকাশে, আজ ভালোবাসা দিবস। এমন দিনেই তো ভালোবাসার ক্ষনগুলো চিরসবুজ রুপ ধারন করে সবসময়ের মত। তা যতই পুরনো হোক, ধুলোয় মিশে যাক।
রাঙামাটির দিকে নীল রঙের টয়োটা গাড়ীটা দ্রুতই পাহাড়ের উচু নিচু আর আকা-বাকা পথ ধরে এগিয়ে চলেছে শাওন আর নদীকে নিয়ে। সেই শহরের দিকে এগিয়ে চলছে যার সবটাই সুন্দর আর সুন্দর। অপরূপা রাঙামাটিই হতে পারে ভালোবাসা উপভোগ করার সেরা জায়গা। সেখানেই যাচ্ছে নদী আর শাওন। যেখান থেকে দুজনার শুরু এবং এক সুপ্তির সাথে বিচ্ছেদ। যে সুপ্তি এখনো নাকি কারো অপেক্ষায় আছে, যার ব্যাকগ্রাউন্ড খুব শক্ত। শাওনের হাতে হাত রাখল নদী এবং একটু কাছে সরে এসে শাওনের কাধে মাথা রেখে দুর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে শাওনের কাছে জানতে চাইল, মনে পড়ছে সেই দিনগুলোর কথা ? শাওন নদীর হাতটা শক্ত করে ধরে চোখে চোখ রেখে একটা জমনো নিঃশ্বাসকে বিদায় দিয়ে জানান দেয়, খ-ুউ-ব।
ভালোবাসার বাণী :
হুমায়ুন আহমেদ- ভাল লাগা এমন এক জিনিস যা একবার শুরু হলে সব কিছুই ভালো লাগতে থাকে।
রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ- তুমিই শুধু ভালোবাসা রাখতে গিয়ে ছড়িয়ে ফেললে চতুর্দিকে অসাবধানে ভালোবাসা ছড়িয়ে ফেললে চতুর্দিকে।
মহাদেব সাহা- তোমাকে ভুলতে চেয়ে তাই আরো বেশি ভালোবেসে ফেলি, তোমাকে ঠেলতে গিয়ে দূরে আরো কাছে টেনে নেই যতোই তোমার কাছ থেকে আমি দূরে যেতে চাই ততো মিশে যাই নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে।
আলবার্চ আইনস্টাইন- ভালোবাসায় পতনের জন্য কোনোভাবেই আমরা মহাকর্ষ-অভিকর্ষকে দায়ী করতে পারি না।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়- বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বলেছিল, যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালোবাসবে সেদিন আমার বুকেও এ-রকম আতরের গন্ধ হবে।
গল্প… এসএমএস ভালোবাসা :
কেউ যদি অভিমানে তোমার সাথে কথা না বলে, বুঝে নিবে সে তোমায় আড়ালে মিস করে.. আর কেউ যদি না দেখে কাঁদে, বুঝে নিবে সে তোমায় ভীষণ ভালবাসে..!
যে ভালবাসা বুঝে না, তাকে ভালবাসা শিখাতে যাবেন না! কারন সে ভালবাসা শিখবে আপনার কাছে, কিন্তু ভালবাসবে অন্য জনকে! আর কষ্ট পাবেন আপনি।
কাউকে দুর থেকে ভালবাসাই সব থেকে পবিত্র ভালোবাসা। কারন, এ ভালোবাসায় কোন রকম অপবিত্রতা থাকে না, কোন শারীরিক চাহিদা থাকে না। শুধু নীরব কিছু অভিমান থাকে, যা কখনো কেউ ভাঙায় না। কিছু অশ্রু বিন্দু থাকে, যা কেউ কখনো মুছতে আসে না। আর সবার অজান্তে আড়ালে একা যেখানে একজনই রানী/রাজা।
“ভালোবাসা” শব্দটা হয় না কখনো পুরানো.. হয় না কখনো মলিন.. হয় না ধূসর কিংবা বর্নহীন.. যা শুধু রংধনুর রঙে রঙিন.. হোক না সেটা এপার কিংবা ওপারের.. তারপরেও ভালোবাসা তো শুধুই ভালোবাসা!
শুধু কাছে পাওয়ার জন্য ভালবাসা নয়। শুধু ভালো লাগার জন্য ভালবাসা নয়। নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে ভালোবাসার মানুষকে সুখী রাখার নামই ভালবাসা।
যখন কেউ কারো জন্য কাঁদে সেটা হল আবেগ। যখন কেউ কাউকে কাঁদায় সেটা হল প্রতারনা। আর যখন কেউ কাউকে কাঁদিয়ে নিজেও কেঁদে ফেলে! সেটাই হল প্রকৃত ভালবাসা!
ভালবাসা মানে আবেগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হৃদয়ের অভ্যন্তরীণ একটা অনুভুতি, যা কেবল শুধু মাত্র ভালবাসার মানুষের সামনে ভাষায় অথবা আচরণে প্রকাশ হয়।
প্রথম দেখায় কখনো ভালোবাসা হয় না। যা হয় তা হল ভালো লাগা। আর সেই ভালো লাগা নিয়ে ভাবতে থাকলে সৃষ্টি হয় ভালবাসা।
ভালবাসা স্বপ্নীল আকাশের মত সত্য, শিশির ভেজা ফুলের মত পবিত্র.. কিন্তু সময়ের কাছে পরাজিত, বাস্তবতার কাছে অবহেলিত..!!
গল্পটি মর্মস্পর্শী ভালোবাসার :
(বিদেশি পত্রিকা থেকে নেয়া)
পুরো একটা বছর হয়ে গেল ৩৭০ বিমানের কোনও খোঁজ মিলল না। আস্তে আস্তে স্মৃতির আড়ালে চলে যাচ্ছে মাঝ আকাশে হারিয়ে যাওয়া মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের বেজিংগামী যাত্রীবিমান ৩৭০। উদ্ধারকারী দল আশা ছেড়ে দিয়েছে। বিভিন্ন দেশের সরকারও প্রায় ধরেই নিয়েছে আর কোনও দিন পাওয়া যাবে না। কিন্তু সবাই ভুলে যেতে বসলেও ভোলেনি ৩৭০ বিমানের যাত্রী আর বিমানকর্মীদের পরিবারের লোকেরা। এক বছর পর হারিয়ে যাওয়া বিমানের এক যাত্রীর ১০ বছরের ছেলে চিঠি লিখেছে তার বাবাকে। সেই চিঠিটাই এই পোস্টে লিখলাম।
প্রিয় বাবা,
বাবা পুরো একটা বছর কেটে গেল তবু তুমি এলে না। তবে জানো তোমার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আমি একটুও ক্লান্ত হয়নি। কেন জানো! আসলে আমার বন্ধুদের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ নিয়েছি। ওরা ওদের বাড়িয়ে লোকের কাছে শুনে আমায় বলেছে, তুমি নাকি আর কোনও দিন ফিরবে না কারণ নাকি তোমার খোঁজ আর কোনও দিন পাওয়া যাবে না। ওদের কথা শুনে আমার হাসিই পেয়ে গিয়েছিল। আমি জানি তুমি ফিরবে, ফিরবে, ফিরবে। তুমি যে প্লেনে ছিলে সেই ৩৭০ টা কোথাও না কোথাও নিশ্চই আছে।
তুমি আমায় একটা গ

















