যুবলীগ নেতা নয়ন হত্যার ঘটনায় উত্তাল লংগদু: গুজবে উত্তেজি হয়ে পাহাড়িদের বড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ, ১৪৪ ধারা জারি

659

ওমর ফারুক মুছা- ২ জুন ২০১৭, দৈনিক রাঙামাটি:  খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের পাশে লাশ পাওয়া লংগদু যুবলীগ নেতা নুরুল ইসলাম নয়ন হত্যাকান্ডের জের ধরে শুক্রবার লংগদুতে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়। এসময় শতাধিক ঘরে অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় পরিণত হয়। পরিস্থিতি শান্ত করতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত লংগদুতে ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে বিপুল পরিমাণ পুলিশ ও সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। রাঙামাটি জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তাগণ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছে। এ সময় প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্থানীয়দের সাথে জরুরী বৈঠক করে সকলকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী জানাগেছে, বৃহস্পতিবার লংগদু উপজেলা থেকে ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালক ও স্থানীয় সদর ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন দুইজন উপজাতীয় যাত্রী নিয়ে দীঘিনালার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। কিন্তু দুপুরের পর দীঘিনালার চারমাইল এলাকায় তার মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে এলাকাবাসী পুলিশকে খবর দেয়। পরে সন্ধ্যায় ফেসবুকে তার মৃতদেহের ছবি দেখে পরিবার ও বন্ধুরা তাকে সনাক্ত করে। শুক্রবার সকালে নয়নের লাশ লংগদুতে তার গ্রামের বাড়ি বাইট্টাপাড়া আনা হয়। সেখান থেকে লংগদু বাসির ব্যানারে কয়েক হাজার বাঙালির একটি বিশাল শোক মিছিল উপজেলা সদরের দিকে যাচ্ছিল জানাজার উদ্দেশ্যে। হঠাৎ একই উপজেলার ঝর্ণাটিলা এলাকায় মারফত আলী নামের এক বাঙালির বাড়িতে দুর্বৃত্তরা আগুন দিয়েছে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে মিছিল থেকেই প্রধান সড়কের পাশের লংগদু উপজেলা জনসংহতি সমিতির কার্যালয়সহ আশেপাশের পাহাড়িদের বাড়িঘরে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করা শুরু হয়। এ সময় বাড়ী-ঘরে কোনো বাসিন্দা ছিল না। জানা গেছে সম্ভাব্য গোলযোগের আশংকায় আগের দিন রাতেই স্থানীয় পাহাড়িরা বাড়ীঘর থেকে সরে পড়ে। ঘটনায় কোন হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও তিনটিলা পাড়ায় পাহাড়িদের শতাধিক বাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয় বলে জানা গেছে। ঘটনার সময় বিপুল সংখ্যক পুলিশ প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়েও পরিস্তিতি সামাল দিতে পারেনি বলে জানিয়েছে প্রত্যক্ষদর্শিরা। পরে ব্যাপক সংখ্যক সেনাবাহিনী মোতায়েন হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

পরে উপজেলা পরিষদ মাঠে নয়নের জানাজা ও শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। শোকসভায় বক্তব্য রাখেন উপজেলা চেয়ারম্যান তোফাজ্জ্বল হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন, জেলা পরিষদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো: জানে আলম, পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদের জেলা সভাপতি আলমগীর হোসেন, উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাাদক শফিকুল ইসলাম, বাঙালি নেতা এডভোকেট আবছার আলী।

বক্তব্য চলার এক পর্যায়ে সেখানে উপস্থিত হন সেনাবাহিনীর লংগদু জোন কমান্ডার লে: কর্নেল আ: আলীম চৌধুরী ও লংগদু থানার অফিসার মোমিনুল ইসলাম। এসময় তারা সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে নয়নের খুনিদের গ্রেফতারের আশ^াস দেন। পরে ১৪৪ ধারা জারি ও বিশেষ আইনশঙ্খলা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

তিনটিলা এলাকার বাসিন্দা ও উপজেলা জনসংহতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনিশংকর চাকমা জানিয়েছেন, আমাদের পাড়ার একটি ঘরও অবশিষ্ট নেই। প্রায় দুইশতাধিক বাড়িঘর সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, এই হত্যার ঘটনার সাথে তো আমাদের কোন সম্পৃক্ততা নেই, আমরা তো কিছুই জানি না, তবুও কেনো আমাদের বাড়ি ঘর আগুনে পোড়ানো হলো জানিনা। তিনি কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, ১৯৮৯ সালে একবার নিঃস্ব হয়েছিলাম আগুনে, আবার নিঃস্ব হলাম। তিনিসহ অসংখ্য মানুষ স্থানীয় বনবিহারে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে আগুনের ঘটনায় পাহাড়ী-বাঙালী একে অপরকে দায়ী করেছে। এ নিয়ে বাঙ্গালী বিক্ষোভকারীরা পাহাড়িদের ঘরবাড়ি ও দোকানে অগ্নিসংযোগ করেছে বলে অভিযোগ পাহাড়িরা। পক্ষান্তরে বাঙালীরা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, পাহাড়ীরা নিজেরা নিজেদের ঘর বাড়িতে আগুন লাগিয়ে বাঙালীদের উপর দোষ চাপাচ্ছে। তারা বলেন, বারবার এভাবে মোটর সাইকেল চালক হত্যার মাধ্যমে পাহাড়িরা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করছে। ঘটনাটি পরিকল্পিত বলেই তারা আগে থেকেই ঘরবাড়ি থেকে লোকজন সরিয়ে রাখে এবং সময় বুঝে আগুন দেয়।

শোকসভায় বক্তব্য প্রদানকালে রাঙামাটি জেলা পরিষদ সদস্য মো. জানে আলম বলেন, পার্বত্য এলাকার চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীরা বারবার নিরীহ বাঙালীদের হত্যা করছে। এই চাঁদাবাজদের নির্মূল করতে হবে। সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের আইনের আওতায় আনতে হবে। উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বলেন, গতকাল দুজন পাহাড়ি নুরুল ইসলামের মোটরসাইকেল ভাড়া করেন। এরপর থেকে তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, পাহাড়িরা নুরুল ইসলামকে হত্যা করেছেন। অবিলম্বে এই হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবী জানান।

লংগদু উপজেলা সমঅধিকার আন্দোলনের সভাপতি খলিলুর রহমান বলেন, আমরা লংগদুবাসির ব্যানারে সর্বদলীয়ভাবে নয়নের লাশ গোসল শেষে জানাজার জন্য উপজেলা সদরের মাঠের দিকে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ খবর আসে ঝর্ণাটিলায় একটি বাঙালী বাড়ীতে অগ্নিসংযোগের খবর আসায় মিছিলের উত্তেজিত লোকজন জনসংহতি সমিতির কার্যালয়ে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে, পরে পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান জানিয়েছেন, বিষয়টি জানার সাথে সাথেই আমরা লংগদু উপজেলায় ১৪৪ ধারা জারি করেছি। আইনশৃংখলা পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক আছে এবং আইনশৃংখলাবাহিনী সর্বোচ্ছ সতর্কবস্থায় আছে।

প্রসঙ্গত, ১৯৮৯ সালে এই তিনটিলা এলাকায় তৎকালিন উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুর রশীদকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এরপর বিক্ষুদ্ধ বাঙালীরা এই পাড়ায় ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করেন এবং ওই এলাকার পাহাড়ীরা দীর্ঘদিন ভারতে উদ্বাস্তু হিসেবে ছিলেন এবং ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সাক্ষরিত হওয়ার পর দেশে ফেরত আসেন।

পোস্ট করেন- শামীমুল আহসান, ঢাকা ব্যুরো প্রধান ।