রাঙামাটিতে বাপেক্সের তেল গ্যাস অনুসন্ধানে জরিপ: গোপন মত বিনিময় সভায় লারমার ক্ষোভ, ইউপিডিএফ’র প্রতিবাদ

414

photo-dr

আলমগীর মানিক/শামীমুল আহসান- ১২ অক্টোবর ২০১৬, দৈনিক রাঙামাটি: রাঙামাটি জেলায় তেল গ্যাস অনুসন্ধানে জরিপ চালানোর জন্য একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। এ পর্যায়ে রাঙামাটির দু’টি উপজেলাসহ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের দু’টি এলাকা মিলে মোট চারটি অঞ্চলে তেল গ্যাস অনুন্ধানের গভির জরিপ পরিচালনা করা হবে। এর আগে প্রাথমিক অনুসন্ধানে এই চারটি এলাকাতেই খনিজ পদার্থ থাকার আলামত পেয়েছিল বাপেক্স।  সেই জরিপের আলোকেই এবারের প্রকল্পে সুনিুর্দষ্টভাবে কোন কোন পয়েন্টে খনিজ সম্পদ রয়েছে এবং এসব খনিজের প্রকৃতি কি তাও খতিয়ে দেখা হবে।

বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতিকুজ্জামান সোমবার দৈনিক রাঙামাটিকে জানান, আমরা অত্যন্ত আশাবাদী যে, ওই চারটি অঞ্চলেই আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়া যাবে। বাপেক্সের এমডি বলেন, চায়না দু’টি কোম্পনীর সমন্বয়ে একটি (কনসোর্টিয়াম) গ্রুপের সাথে আমারা ইতোমধ্যে প্রথমিক আলোচনা সম্পন্ন করে রেখেছি। এ বিষয়ে প্রায় সকল প্রাথমিক প্রস্তুতি শেষ। মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র এলেই আমরা ওই কনসোর্টিয়ামের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ শুরু করবো।

বাপেক্স সূত্র জানায়, এ পর্যায়ে রাঙামাটি জেলায় বাঘাইছড়ি উপজেলার কাচালং এবং কাপ্তাই উপজেলার সীতা পাহাড়ে এই জরিপ চালানো হবে। সূত্রমতে এমওইউ অনুযায়ী কাপ্তাই উপজেলার সীতাপাহাড় ঘিরে ৬২৬ এবং কাচালং উপজেলার ৯৭৩ বর্গ কিলোমিটার ব্যসার্ধে এই জরিপ চালানো হবে। তবে এ পর্যায়ে  কূপ খনন বা একপ্লেসিভ (বিস্ফোরণমুলক) কোনো কার্যক্রম থাকবেনা। জরিপে মাটি পরীক্ষা ছাড়াও ছোটখাট বরিং এর মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ প্রকৃতি নিশ্চিত হওয়ার পরই কূপ খননের চিন্তা করবে বাপেক্স। রাঙামাটি জেলার এই দু’টি স্পট ছাড়াও কক্সবাজার জেলার চকোরিয়ার জলদি এলাকা এবং চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় এই জরিপ চালানো হবে।

এ বিষয়ে ইতোমধ্যে একটি বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাবনা জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এই সর্ভের বিষয়ে স্থানীয় জনগণকে আস্থায় নিয়েই কাজ করতে চায় বাপেক্স, সে লক্ষ্যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে আলাপ আলোচনা করে প্রকল্প সম্পর্কে তাদের মতামত জানতে চাওয়া হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের কাছ থেকে।

আঞ্চলিক পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সহসাই এ বিষয়ে তাদের মতামত মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রস্ততি নিচ্ছে। সূত্রমতে সোমবার এ লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সভাকক্ষে পরিষদের আহ্বানে এ লক্ষ্যে একটি মত বিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। তবে মত বিনিময় সভায় গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়।

এ বিষয়ে স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মাঝে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আবার উদ্বাস্তু হবার ভয়ে তারা ভীত হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র। সূত্রমতে ইতোমধ্যে কে বা কারা রাঙামাটি জেলায় একটি গুজব ছড়িয়েছে বলে জানিয়েছে আঞ্চলিক পরিষদের বৈঠকে উপস্থিত বেশ কয়েকজন জন প্রতিনিধি। গুজবের তথ্যটিতে জানানো হয়েছে, খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের এই কার্যক্রম শুরু হলে ওই দুই উপজেলার বিপুল সংখ্যক মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়বে। এই সূত্র ধরে পার্বত্য ভূমি বিরোধ আরো জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

সভায় উপস্থিত উপজেলা চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে জানা গেছে, মত বিনিময় সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়ে উপস্থিত অতিথিরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। দাবী করা হয়, এ ধরণের প্রকল্পের লাভ-ক্ষতি সম্পর্কে জনগণকে বিস্তারিত জানাতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সাথে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। একই সাথে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। পাশাপাশি জীব বৈচিত্র কোনোভাই যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হয় সে বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্থদের পুণর্বাসনের বিষয়ে আগেভাগেই ভাবতে হবে বলে মত প্রকাশ করেন স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

সভায় আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা বলেন, পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী এই ধরনের প্রকল্পের এমওইউ স্বাক্ষরের আগেই বিষয়টি আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং সার্কেল চীফসহ হেডম্যান কার্বারীদের সে বিষয়ে অবহিত করা এবং মতামত নেওয়া জরুরী। অথচ এই প্রকল্পে সমঝোতা স্বারক স্বাক্ষরের সময় তা করা হয়নি। এ নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন বলেন, খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে সে ক্ষেত্রে স্থানীয়দের সুযোগ সুবিধা কি হবে। ক্ষতিগ্রস্থরা কি পাবেন এবং সর্বপোরি এই অনুসন্ধান কাজ চালাতে গিয়ে কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধ কোনোভাবে হুমকির মুখে পড়ে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হবে হবে।

রাঙামাটি সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অরুণ কান্তি চাকমা বলেন, সত্যি বলতে কি এই প্রকল্পটি আসলে কোন প্রকৃতির এবং কি ধরণের অনুসন্ধান চালানো হবে সে বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়। আমরা স্থানীয় জনগণের স্বার্থকে অগ্রধিকার দেওয়ার বিষয়ে আমাদের মতামত জানিয়েছি।

আঞ্চলিক পরিষদ আহবানে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে পরিষদ চেয়ারম্যান ছাড়াও বক্তব্য রাখেন, রাঙামাটি আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য উষাতন তালুকদার, রাঙামাটি সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অরুন কান্তি চাকমা, কাপ্তাই উপজেলা চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান, খাগড়াছড়ি হেডম্যান এসাসিয়েশনের সভাপতি শক্তিপদ ত্রিপুরা, আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য হাজী কামাল, রক্তউৎপল ত্রিপুরা, সাবেক যুগ্ম জজ এ্যাড. দীপেন দেওয়ান, সাবেক উপ সচিব প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা প্রমূখ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে খনিজ সম্পদ লুণ্ঠনের ষড়যন্ত্র বন্ধের দাবি ইউপিডিএফ’র

স্টাফ রিপোর্টার- ১২অক্টোবর ২০১৬, দৈনিক রাঙামাটি (প্রেস বিজ্ঞপ্তি): ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) রাঙামাটির কাপ্তাই ও বাঘাইছড়ি উপজেলায় ১ হাজার ৬৪৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃক্ষ সম্পদ নিঃশেষ করার পর দেশের শাসকগোষ্ঠী এখন এখানকার মাটির নীচের খনিজ সম্পদ লুণ্ঠনের ষড়যন্ত্র শুরু করেছে, যা কোন মতেই মেনে নেয়া হবে না।’
আজ ১২ অক্টোবর ২০১৬ বুধবার সংবাদ মাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে ইউপিডিএফের সাধারণ সম্পাদক রবি শংকর চাকমা পাহাড়ি জনগণের মতামত না নিয়ে এককভাবে সরকারের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলেন, ‘সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর তেল গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রমের কীরূপ প্রভাব পড়বে তা আগাম যাচাই না করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত সরকারের পাহাড়ি স্বার্থ-বিরোধী নীতিকেই প্রতিফলিত করে।’
ইউপিডিএফ নেতারা বাপেক্সের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কোন কোম্পানীর পার্বত্য চট্টগ্রামে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের বিষয়ে কী ধরনের চুক্তি হয়েছে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে কোন ধরনের তেল গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে জনগণ তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণই হলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের মালিক।’
অতীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের মতামত ছাড়া সরকারের হাতে নেয়া তেল গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম সফল হয়নি, একই ধরনের প্রচেষ্টা ভবিষ্যতেই সফল হবে না বলে তিনি সরকারকে হুঁশিয়ার করে দেন।

রবি শংকর চাকমা অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাপেক্সের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানান এবং একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ লুণ্ঠনের দেশী বিদেশী চক্রান্তের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
পোস্ট করেন- শামীমুল আহসান, ঢাকা ব্যুরো প্রধান।