রাঙামাটিতে স্বর্ণের আংটি ও প্রাইভেট কারসহ অভিনব প্রতারক

630

attok-pic-1-18-11
॥ স্টাফ রিপোর্টার ॥

রাঙামাটি থেকে অভিনব প্রতারক আটক করেছে কোতয়ালী থানা পুলিশ। প্রাইভেট কারসহ আটক হওয়া এই প্রতারকের নাম আনোয়ার হোসেন (৩০)। সে চট্টগ্রাম জেলার কালুরঘাট মোহরা গ্রামের বাসিন্দা মৃত আলী হোসেনের পুত্র বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ জানায় সোনা বন্ধক রেখে টাকা ধার নিয়ে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই প্রতারক। জুয়েলারি দোকানগুলোতে বিদেশ থেকে আনা খাঁটি সোনার আংটি দেখিয়ে সে বলে ‘ঘুরতে এসে বিপদে পড়েছে’। সে প্রস্তাব দেয় আংটিটি বন্ধক রেখে মূল দামের অর্ধেক টাকা দিতে। আংিট এবং প্রাইভেট কার দেখে দোকানদাররা সহজেই তাকে টাকা দিয়ে ফেলে, অথচ এই আংটি থাকে নকল।

এভাবে টাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতারনা করে আসছে একটি শক্তিশালী প্রতারক চক্র। দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা এই প্রতারক চক্রের হাতে প্রতিনিয়ত ঠকবাজির শিকার হচ্ছিল ব্যবসায়িসহ সাধারণ মানুষ। ফেনী, ছাগলনাইয়া, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে অনেকে স্বর্ণ ব্যবসায়ি নিঃস্ব হয়েছেন। সর্বশেষ শুক্রবার রাঙামাটিতে প্রতারনার মাধ্যমে নকল স্বর্ণের আংটিকে আসল স্বর্ণ বলে বন্ধক রেখে টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের হাতে আটক হয় তারা।

এসময় স্বীকারোক্তি অনুসারে তার ব্যবহৃত প্রাইভেট কার থেকে পাঁচটি নকল স্বর্ণের আংটি উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কোতয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ রশিদ জানিয়েছেন, আমরা জুয়েলারি সমিতির সভাপতির কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথেই রাঙামাটি বের হওয়ার সকল পথেই বেতার বার্তা পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট চেকপোষ্টগুলোতে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের সতর্ক করে দেই।

পরে শুক্রবার পূর্বরাতে রাঙামাটি থেকে চট্টগ্রাম পালিয়ে যাওয়ার সময় শহরের শিমুলতলী চেকপোষ্টে প্রতারকসহ প্রাইভেট কারটি আটক করা হয়। তার কাছ থেকে পাঁচটি আংটি উদ্ধার করা হয়। এই সময় তার অপর সঙ্গী পালিয়ে যায়।

ওসি বলেন, ওমান থেকে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রলেপযুক্ত ৫০টি আংটি এনে সেগুলো সহযোগীদের মাধ্যমে জুয়েলারি দোকানগুলোতে বিক্রি/বন্ধক রেখে প্রতারণা করে আসছিল এরা। প্রতিটি আংটির ওজন প্রায় এক ভরি। আটককৃত প্রতারকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রতারনার অভিযোগে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে কোতয়ালী থানা পুলিশ। মামলার পর তাকে আদালতে চালান দেয়া হবে।

প্রতারক আনোয়ার হোসেন জানায়, সে সেদীর্ঘ দিন ওমানে ছিল। ওমান থেকে আসার সময় বেশ কিছু নকল স্বর্ণের আংটি সাথে করে নিয়ে আসে। পরে তার এক সহযোগির মাধ্যমে প্রতারনার ফাঁদ করে নকল আংটিগুলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় স্বর্ণের ব্যবসায়িদের কাছে বন্ধক দিয়ে ২০-৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়। প্রতারক আরো বলেন, সে দীর্ঘ দিন ধরে একটি সিন্ডিকেট চক্রের মাধ্যমে এই প্রতারনা করে আসছে।

এদিকে গত কয়েক দিন ধরে আনোয়ার হোসেন একটি সাদা কার গাড়িতে করে রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন স্বর্ণের দোকানে আংটি বিক্রি ও বন্ধক রাখতে তৎপরতা চালায়। এতে সন্দেহ হলে স্থানীয় কয়েক স্বর্ণের ব্যবসায়ী পুলিশে খবর দেয়। খবর পেয়ে প্রতারককে আটক করে পুলিশ।

জানাগেছে, আরবীয় দেশগুলোতে স্বর্ণের দাম কম হওয়ায় সেসব দেশে অবস্থান করা প্রবাসী বাংলাদেশীরা দেশে আসার সময় স্বর্ণের জিনিসপত্র নিয়ে আসে এবং সেগুলো বিভিন্ন জনের কাছে বিক্রি করে। অপেক্ষাকৃত কমমূল্য এবং খাটি সোনা হওয়ার বিশ্বাসে দেশের মানুষজন সেসব অলংকার কিনে নেয় অনায়াসে। সাধারণ মানুষজনের এই অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে বিদেশের মাটিতে বসেই প্রতারণার নতুন ফাঁদ পাতে একটি চক্র।

সেরকম একটি চক্র বর্তমানে রয়েছে ওমানে। নকল সোনার আংটি বানিয়ে সেই আংটির উপর দেওয়া হচ্ছে অরিজিনাল ২২ ক্যারেট সোনার প্রলেপ। মাত্র কয়েক দেরহাম আরবী টাকা মূল্যের এই আংটি বাংলাদেশে কিনে আসে অপর একটি প্রতারক চক্র।

এই চক্রটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সেখানকার স্থানীয় জুয়েলারি দোকানগুলোতে উপস্থিত হয়ে বিপদে পড়েছে জানিয়ে আংটি’টি বন্ধক রাখার অনুরোধ জানায়। বিনিময়ে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাওলাত নিয়ে সঠকে পড়ে।

রাঙামাটি জুয়েলারি ব্যবসায়ি সমিতির সভাপতি যগেশ্বর রায় জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার দুপুরে রিজার্ভ বাজারের লঞ্চঘাটস্থ শিল্পী জুয়েলার্স এ গিয়ে সেখানেও একটি আংটি বন্ধক রেখে ২০ হাজার টাকা নিয়ে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর দোকান মালিক কাজল কুমার সাহা আংটি’টি এসিডের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেটি আসল সোনা নয়। আসল সোনার প্রলেপ দিয়ে আংটিটি বানানো হয়েছে মূলত তামা দিয়ে।

পরে ঘটনাটি শহরের সকল জুয়েলারি দোকানদারদেরকে জানিয়ে দিয়ে সতর্ক করে দেওয়া হয়। পরে বিকেলে শহরের টিএন্ডটি এলাকার ফ্যাশন মেলা জুয়েলার্স এ গিয়ে মিন্টু ধর এর দোকানে গিয়ে সেখানেও অনুরূপভাবে একটি আংটি বন্ধক রাখার প্রস্তাব করে প্রতারক চক্রের এক সদস্য। পরে টাকা দেওয়ার কথা বলে সকলে মিলে তাকে ধরার চেষ্ঠা করতেই রাস্তায় প্রাইভেট কার নিয়ে অবস্থান অপর সঙ্গীর সহায়তায় পালিয়ে যায়।

পরে বিষয়টি কোতয়ালী থানা পুলিশের ওসিকে জানালে তিনি সকলকে বিষয়টি জানিয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। এরপর রাতে এক প্রতারককে গাড়ি ও আংটিসহ ধরতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। এই ঘটনায় পালিয়ে যাওয়া আরেক প্রতারককে ধরতে অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ।