সঠিক পরিচর্যা করা হলে কাপ্তাই হ্রদ জাতীয় অর্থনীতিতে আরো অবদান রাখতে পারবে

559

॥ মঈন উদ্দীন বাপ্পী ॥

এশিয়া মহাদেশের মানব সৃষ্ট সর্ববৃহৎ কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই হ্রদ। ১৯৬৩-৬৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার  বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে বাঁধ কর্নফুলি নদীতে বাঁধ দিলে এই মানব সৃষ্ট এ  হ্রদের সৃষ্টি হয়। কিন্তু হ্রদ থেকে বিদুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি এখন এটি বাংলাদেশে মিঠা পানির মাছের অন্যতম উৎস তথা মৎস্য উৎপাদনের বিশাল বাণিজ্যিক ক্ষেত্র। হ্রদের মৎস্য খাত বর্তমানে জেলার মানুষকে অর্থনৈতিক মুক্তি দানের পাশাপাশি দেশের পুষ্টি চাহিদা পুরণসহ অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে।

একটা সময় এই হ্রদ থেকে ৭৫ প্রজাতির মাছ আহরণ করা হতো। সে সময় বাজারে বিক্রি করা হতো বোয়াল, চিতল, রুই, কাতলা, কালিঘনিয়া, সাদাঘনিয়া, তেলাপিয়া, মহাল, কারপু, টুইট্টা, বাঁডা, মলা-ঢেলা, বড় আকারের চাপিলা, বকরি, ফলাই, বাচকুট্টা, ফাইশ্যা, পাপদা, পুঁটি, বাইন, পুঁইয়া, টেংরা, টাকি, গজাল, সিং, শৈল, কুইচ্ছা, মাগুর, ছোট ইছা, সরপুঁটি, আইল, কেচকি, বাইলাসহ উল্লেখযোগ্য প্রজাতির মাছ।

কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এক সময় এই হ্রদে মাছের প্রকৃতিক প্রজনন হ্রাস পেতে থাকে। এ ছাড়াও ডিম ছাড়ার সময় অসাধু ব্যবসায়ী ও কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের যোগসাজসে মাছ শিকার করে গোপনে বাজারজাত করায় ধীরে ধীরে মাছের ওজন এবং উল্লেযোগ্য প্রজাতিগুলোর অধিকাংশ বিলুপ্ত হতে থাকে।

মৎস্য গবেষণাগার সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৮-৮৯ সালের দিকে প্রথমে মৎস্য প্রজাতি বিলুপ্তির প্রকাশ পায়। প্রায় দু’দশক পর দেখা যাচ্ছে, হ্রদ থেকে প্রায় ৩৭ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য সীলন, দেশি সরপুঁটি, ঘাউরা,বাঘাইড়, মোহিনী বাটা, দেশি পাংগাস। বর্তমানে আরো অনেক সুস্বাধু মাছ এখন বিলুপ্তির পথে এবং দুই প্রজাতির কচ্ছপ অনেক আগে বিলুপ্তি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ঠ সূত্রটি জানায়।

সচেতন বিজ্ঞ মহলরা  অভিযোগ করে বলছেন, কাপ্তাই  হ্রদ নিয়ে কারো মাথা ব্যাথা নেই। প্রজনন ও ডিম ছাড়ার সময় মাছ শিকার নিষেধ থাকলেও অসৎ ব্যবসায়ীরা রাতের আঁধারে মাছ শিকার করে সড়ক পথেই তা পাচার করে। তাছাড়া হ্রদ ঘিরে অবৈধ দখলবাজদের কারণে হ্রদের পরিধি দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। পয়:নিষ্কাশনের কারণে বাড়ছে দূষণ।

নাম প্রকাশে অনিশ্চুক শহরের মৎস্য ব্যবসায়ীরা ক্ষোভের সাথে অভিযোগ করে বলেন, অতীতে মৎস্য কর্পোরেশন অনভিজ্ঞদের ব্যবসার লাইসেন্স দিয়েছিলো। একজন মৎস্য ব্যবসায়ীকে সরকারি লাইসেন্স পেতে কি কি থাকা দরকার তার প্রয়োজনও মনে করেননি কর্পোরেশন। যার ফলে অনভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা মানেননি কোন প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম কানুন।

জেলা মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন এর ব্যবস্থাপক ও প্রজেক্ট ডিরেক্টর কমান্ডার (নৌবাহিনী) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন,  ২০১৩- ১৪ অর্থ বছরে মৎস্য আহরিত হয়েছে ৮৮১৩ মে.টন এবং রাজস্ব আদায় হয়েছে ৭ কোটি ৩৪  লক্ষ টাকারও বেশি, ২০১৪- ২০১৫ আহরিত মৎস্য ৮৬৪৪.৮০ মে.টন এবং রাজস্ব আদায় ৯ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকারও বেশি। এবারের সর্বশেষ ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরে মৎস্য আহরিত হয়েছে ৯৫৮৮.৫৫ মে.টন এবং রাজস্ব আদায় হয়েছে ১০ কোটি ৫৪ লক্ষ টাকারও বেশি। সর্বশেষ ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে মৎস্য আহরিত হয়েছে ৯৯৭৫ মেট্রিক টন এবং রাজস্ব আদায় হয়েছে ১০ কোটি ৬০ লক্ষ ৭৪ হাজার টাকা।

কমান্ডার বলেন, সঠিক ব্যবস্থাপনা করা গেলে এই হ্রদ জাতীয় অর্থনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। এজন্য সরকারকে হ্রদ নিয়ে কাজের পরিধি বাড়াতে হবে।

কমান্ডার জানান, মাছের প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষে প্রতি বছর  মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে তিন মাসের জন্য হ্রদে সকল প্রকার মাছ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়। সেই সাথে হ্রদের স্থানে মাছ  ডিম ছাড়ে এমন চ্যানেলেগুলোতে কোস্ট গার্ড নিয়োগ করা হয়েছে এবং এই স্থান গুলোকে মাছের অভয়াশ্রম জোন হিসেবে চিহিৃত করা হয়েছে। কমান্ডার বলেন, হ্রদের মৎস্য সম্পদকে রক্ষা ও দূষণ মুক্ত রাখার জন্য হ্রদকে ড্রেজিংয়ের আওতায় আনতে হবে। পাশাপশি অবৈধ দখল থেকে হ্রদ যাতে সুরক্ষা থাকে সেদিকে স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি বাড়াতে হবে।