সরকারের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত ও পার্বত্য প্রেক্ষাপট

306

sangu-gas-field-300x199

 

আনোয়ার আল হক- ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, দৈনিক রাঙামাটি : দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা পুরণ এবং সাগর ও ভূমিগর্ভের অনুদঘাটিত গ্যাসের মওজুদ সম্পর্কে নিশ্চিত হবার লক্ষ্যে দ্রুততম সময়ে দেশের বিভিন্ন সম্ভবনাময় অঞ্চলে এবং সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তেল গ্যাসের মজুদ বাড়াতে সরকারের এ উদ্যোগ সময়োপযোগী। দেশের জ্বালানি চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। তাই জ্বালানির জোগানও বাড়াতে হবে। এ লক্ষ্যে ২০২১ সাল পর্যন্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করে একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দক্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পৃথক কারিগরি কমিটিও গঠন করা হচ্ছে। দ্বি-মাত্রিক ও ত্রি-মাত্রিক ভূকম্পন জরিপগুলো পরিকল্পনামতো সম্পন্ন করা হলে নতুন গ্যাসাধার আবিষ্কারের পাশাপাশি বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর পার্শ্ববর্তী এলাকায় অনেক বেশি পরিমাণ গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত সপ্তাহে ভোরের কাগজের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশে আবিষ্কৃত গ্যাস দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে নতুন গ্যাস পাওয়া জরুরি। জ্বালানি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাবে। এ আশঙ্কায় সরকারের উচ্চপর্যায় বিপুল সম্ভাবনার ক্ষেত্র গভীর সাগরে তেল-গ্যাস দ্রুত অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু সাগরে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের কাজ অত্যন্ত কঠিন। একমাত্র দেশীয় কোম্পানি বাপেক্সের সে সক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি। ফলে এখানে একমাত্র বিদেশি কোম্পানিই এ কাজ করতে পারবে। তবে বিদ্যমান উৎপাদন বণ্টন চুক্তিতে (পিএসসি) আইওসিগুলো সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজেও আগ্রহী হচ্ছে না। ফলে বিশেষ আইনে গভীর সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য অভিজ্ঞ ও সক্ষম বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ নিয়ে একটি সারসংক্ষেপে সম্মতিও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জানা যায়, স¤প্রতি বিনা প্রতিযোগিতায় সমুদ্রের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লক এবং মায়ানমার সীমান্তবর্তী ১২, ১৬ ও ২১ নম্বর ব্লক বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এক্ষেত্রে আগের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান না করে ২০১০ সালে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য প্রণীত বিশেষ আইনের ক্ষমতাবলে এই কাজ দেয়া হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদেশি কোম্পানির সহযোগী হিসেবে গ্যাসের আধার খুঁজে বের করতে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১৭টি স্থানে দ্বিমাত্রিক ভূকম্পন (টুডি সিসমিক) জরিপ পরিচালনা করবে বাপেক্স। প্রতি বছর এক হাজার ৪০০ লাইন কিলোমিটার করে মোট নয় হাজার ৮০০ এলকিমি এলাকায় এ জরিপ চলবে। একইসঙ্গে ১১টি গ্যাসাধার ভূ-গঠনে নতুন কূপ খননের স্থান নির্ধারণে ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ভূকম্পন জরিপ পরিচালনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দুই হাজার ৯৪০ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এ কার্যক্রম চলবে।

দেশে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত ২৬টি গ্যাসক্ষেত্রে মজুদ গ্যাসের অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে। অবশিষ্ট মজুদ গ্যাস ১৪ বছরের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স¤প্রতি আবিষ্কৃত গ্যাসের মজুদ, বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে একটি প্রতিবেদন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, কয়েক বছরে দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান মেলেনি। মায়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির পর সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তবে বাস্তবে তা কজে লাগানো যায়নি। এ থেকে প্রতীয়মান, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আমাদের উদ্যোগ শেষাবধি পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। সমুদ্রে তো বটেই, স্থলভাগেও নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে উল্লেখ করার মতো কোনো সাফল্য নেই।

আমরা জানি যে, পার্বত্য তিন জেলায় গ্যাসসহ অন্যান্য খনিজ সম্পদের এক বিশাল ভান্ডার থাকার উজ্জল সম্ভবনা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা বরাবরই মত প্রকাশ করে আসছেন। ইতোপূর্বে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় পার্বত্য এলাকায় তেল গ্যাস অনুসন্ধানে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। কিন্তু সে সেময়ের প্রতিকুল প্রেক্ষাপটসহ নানা বাস্তবতায় সেই অনুসন্ধান কার্যক্রম বেশীদুর এগুতে পারেনি। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের ফলে পাহাড়ে নতুন পরিবেশ ও নতুন প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে পার্বত্য তিন জেলায় আবারও গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করা জরুরি বলে মনে করেন অভিজ্ঞ মহল।

গ্যাস আমাদের জাতীয় উন্নয়ন ও জীবনযাপন প্রণালীর গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। যেহেতু গ্যাস কোনো নবায়নযোগ্য জ্বালানি নয়, তাই একে অফুরান ভাবার কোনো অবকাশ নেই। জনসংখ্যা বাড়ার ফলে গৃহস্থালি ও শিল্প কলকারখানায় কাজে গ্যাসের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে এবং তা বাড়তেই থাকবে। এই বাড়তি চাহিদা মোকাবেলার জন্য চাই আশু ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং ওই পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন। একই সঙ্গে উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই বাপেক্সকে শক্তিশালী করা জরুরি। পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানিগুলোকে নিজ স্বার্থ সুরক্ষায় আহ্বান জানানো জরুরি। গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখতে সমুদ্র ও স্থলভাগে দ্রুত নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের চললাম কার্যক্রম এগিয়ে যাক- এই প্রত্যাশা করছি।

লেখক- সম্পাদক, দৈনিক রাঙামাটি।
পাস্ট করেনন- শামীমুল আহসান, ঢাকা ব্যুরোপ্রধান