সরকারের বৈষম্য নীতির কারণে দিন দিন বেকার হয়ে পড়ছে পার্বত্য জেলার ঠিকাদারেরা (পর্ব ২)

328

॥ আনোয়ার আল হক ॥

[পূর্ব প্রকাশের পর] পার্বত্য জেলার ঠিকাদারেরা বলছেন, ‘টার্ন ওভার’ সারাদেশের সমস্যা হলেও পাহাড়ের স্বল্প ও মধ্য পুঁজির ঠিকাদারদের জন্য ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। ঠিকাদারদের মতে, পার্বত্য এলাকায় বহুকাল আগে থেকেই উপজাতীয় ঠিকাদারদের আয়করবিহীন কাজ করার সুযোগ রয়েছে। বাঙালি ঠিকাদারদের এই সুযোগ না থাকায় অনেক সময় তারা উপজাতীয় ঠিকাদারদের লাইসেন্স ধার নিয়ে কাজ করে থাকেন। কিন্তু এখন টার্নওভার সিস্টেম চালু থাকলে পাহাড়ের বেশিরভাগ বাঙালি ঠিকাদার আর কখনই বার্ষিক কর্মসম্পাদন মূল্যমানে (টার্ন ওভারের) হিসেবে পড়বে না। পক্ষান্ততে উপজাতীয় ঠিকাদারদের টার্ন ওভার ফুলে ফেঁপে উটবে; সময়ের ব্যবধানে বাঙালি ঠিকাদারদের হয়তো নিজের লাইসেন্স ব্যব করে আর টেন্ডারে অংশ নেওয়ার অবস্থাই থাকবে না। এই বক্তব্য প্রদানকারী ঠিকাদারেরা কেউই নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি; কারণ এতে তাদের চলমান (ধার করা লাইসেন্স এর) কাজেও সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা।

ঠিকাদারদের মতে বর্তমানে দেশে চলমান ইজিপি সিস্টেমে ‘টার্ন ওভার’ নামক শর্তটি মূলতঃ পুঁজিপতিদের প্রেসক্রাইব করা সিস্টেম। এর ফলে সারাদেশের সকল ঠিকাদারী বর্তমান বোয়ালের পেটে ঢুকে গেছে। এখন সকল টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছে জাতীয় পর্যায়ের ৮/১০টি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় ঠিকাদার এখন অনেকটা তাদের মাঝি হিসেবে কাজ করছেন।

তারা জানান বাঙালি ঠিকাদারদের কাজভেদে সাড়ে ৩% থেকে ১০% পর্যন্ত আয়কর দিতে হয়। তারা টেন্ডার দেওয়ার সময় এই ব্যয়ের বিষয়টি মাথায় রেখেই রেট কোড বসান। পক্ষান্তরে উপজাতীয় ঠিকাদারেরা রেট দেওয়ার সময় স্বাভাবিকভাবেই তাদের থেকে রেট কম দিতে পারেন। এতে তারা প্রতিযোগীতায় পিছিয়ে পড়ছেন। যে কারণে তাদের বাধ্য হয়ে লাইসেন্স ধার নিয়ে কাজ করতে হয়।

ঠিকাদারদের মতে, পাহাড়ের মানুষের জন্য আয়কর মওকুফের সুবিধা প্রদান করা হলে তা এ এলাকায় বসবাসকারী সকল সম্প্রদায়ের জন্যই অবারিত করা উচিৎ। অথবা আয়কর মওকুফের বিধান চালু রাখলেও তার একটা সীমা নির্ধারণ করা হলেও কিছুটা সমতা আসবে। এ ক্ষেত্রে ১০ লাখ, ২০ লাখ বা ৫০ লাখ টাকার কাজে আয়কর মওকুফ তার বেশি মূল্যমানের কাজে আয়কর দিতে হবে এমন বিধানও চালু করা যেতে পারে বলে অনেকই মত প্রকাশ করেছেন।

এ বিষয়ে ঠিকাদার ও ক্রীড়া সংগঠক শফিউল আজম বলেন, ‘একটা সিলিং নির্ধারণ করে দিলে বিষয়টি যৌক্তিক হবে। কারণ এখন উপজাতীয় ঠিকাদাররাও স্বয়ং সম্পূর্ণ। তিনি বলেন, পাশাপাশি টার্ন ওভারের ক্ষেত্রে পার্বত্য এলাকার জন্য শিথিল করার বিধান থাকা উচিৎ। তবেই এখানকার ঠিকাদারেরা বাঁচতে পারবে।

এ বিষয়ে বাঙালি ঠিকাদার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজি মোঃ শাহ আলম বলেন, পাহাড়ের উপজাতীয় জনগণকে অনগ্রসর জাতি হিসেবে হিসেবে বিবেচনা করে পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি যখন প্রণয়ন করা হয়েছিল; তখনকার প্রেক্ষাপট আর আজকের প্রেক্ষাপট এক নয়। তাই বিষয়টি রিভিও করা সময়ের দাবি। এখানে এখন সবার জীবন ধারাই একরকম।

সেলিম এনড ব্রাদার্সের মালিক মোঃ সেলিম উল্লাহ বলেন, ‘ভাই এই ব্যবসায় এসে যখন নতুন নতুন কাজ করেছি। তখন নেশার ঘোরে ছিলাম। এখন অভিজ্ঞতা হওয়ার পর বুঝতে পারছি. পাহাড়ের বাঙালি ঠিকাদারেরা তিন চার প্রকারে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; যা আর প্রকাশ করে বলতে চাই না’।

সালেহা এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধিকারী মোঃ জাহাঙ্গীর কামাল বলেন, কেউ প্রকাশ্যে বলতে পারছে না অনেক কিছুই, কিন্তু সবাই বুঝতে পারছে দিন দিন তারা অবনতির দিকে যাচ্ছেন। একমাত্র গণমাধ্যম এবং নেতৃবৃন্দ সোচ্চার হলেই এই ঠিকাদারদের নিঃস্ব হওয়ার পথ বারিত হতে পারে। তিনি বলেন, প্রতিযোগীতায় হেরে যাওয়া ঠিকাদারদের জামানত ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতাও ছোট ঠিকাদারদের সমস্যায় ফেলছে। তাই ঠিকাদারদের জন্য শীঘ্রই ডাটাব্যাংক স্থাপিত হওয়া প্রয়োজন।

কেন্দ্রীয় ডাটা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ই-জিপিতে নিবন্ধিত মোট ঠিকাদার রয়েছেন ৬৩ হাজারের কিছু বেশি। কিন্তু সারাদেশে দরপত্রের কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন মাত্র গুটিকয়েক ঠিকাদার। কারণ বেশিরভাগ ঠিকাদারই ই-টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ পাচ্ছেন না। কাজ না পেলেও ছোট ঠিকাদার বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবছর সংশ্নিষ্ট বিভাগে তালিকাভুক্তি নবায়নের জন্য দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা, আবার ই-জিপিতে নিবন্ধন নবায়নের জন্য একইভাবে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা ফি দিতে হয়। পাশাপাশি দরপত্র জামানত চুক্তি সম্পাদন শেষ না হওয়া পর্যন্ত টাকা রেখে দেওয়ার পদ্ধতি থাকায় ছোট ঠিকাদারদের অন্যান্য দরপত্রে অংশগ্রহণও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে অনেক ছোট ঠিকাদার বৈধভাবে কাজ না পাওয়ায় বড় ঠিকাদারদের লাইসেন্স ধার নিয়ে কিছু ব্যবসা করছেন। এতে অনেক ক্ষেত্রে অযোগ্য ঠিকাদাররাও অধিক টার্নওভারধারী ঠিকাদারদের বৈধ প্রতিনিধি হয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। এতে কাজের মানও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মূলত: জেলা পর্যায়ের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বড় ঠিকাদারদের কমিশন দিয়ে কাজ করছে। মোট কথা ই-টেন্ডার শুরু হওয়ার পর গত আট নয় বছর ধরে বড় ঠিকাদাররা একচেটিয়া ব্যবসা করছেন।

এভাবে ইজিপি সিস্টেমে নতুন ও ছোট ঠিকাদাররা নানারকম সমস্যা মোকাবিলা করছেন। তাদের দাবি ই-জিপি পদ্ধতি আরও সহজীকরণ এবং চলমান সমস্যাগুলো সমাধানে সবগুলো বিষয় রিভিও করা উচিৎ। এর মধ্যে দরপত্রে হেরে যাওয়া ঠিকাদারদের জামানত ফেরত পাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আসা প্রয়োজন বলে মনে করছেন ঠিকাদারেরা।

আয়করের ক্ষেত্রে জাতি ভিন্নতার বিষয়ে জানতে চাইলে রাঙামাটি সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শাহে আরেফীন বলেন, অনেক বাঙালি ঠিকাদার বিষয়টি আমাদের জানিয়েছেন, কিন্তু উপর থেকে কোনো নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত আসলে আমাদের তেমন কিছুই করার নেই। তিনি বলেন, এটা ন্যাশনাল লেভেলের বিষয়। তিনি এও দাবি করেন যে, স্থানীয় ৩৩ জন ঠিকাদার বর্তমানে সড়ক বিভাগের প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করছে বলে তিনি জানেন। তবে তাদের কাজের ফার্মের মালিক আসলে কে তা ক্ষতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা দেখা না দেওয়ায় সড়ক বিভাগ সেটা খতিয়ে দেখেনি।

১ম পর্বঃ https://cutt.ly/6nlG1y9