
ঢাকা ব্যুরো অফিস, দৈনিক রাঙামাটি : শান্তিচুক্তি অমান্য করে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতি মাসে এক হাজারের অধিক বাঙালি অবৈধ ভাবে অনুপ্রবেশ করে বসতি স্থাপন করছে। কেউ তাদের বাধাও দিচ্ছে না। যা শান্তিচুক্তির সুস্পষ্ট লংঘণ। ১ ডিসেম্বর ২০১৫ মঙ্গলবার সিরডাপ আন্তর্জাতিক কনফারেন্স সেন্টারে আদিবাসি বিষয়ক সংসদীয় ককাস আয়োজিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন’ শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী সংলাপ আয়োজনে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠির পক্ষ থেকে এ অভিযোগ করা হয়।
অনুষ্ঠানে যোগদেয়া খাগড়াছড়ি থেকে আসা এক আদিবাসি নারী নেত্রী এ অভিযোগ করেন। অন্নান্য বক্তারাও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেন। বলা হয়, সড়ক পথে প্রতিদিন বিভিন্ন রুটে বাসে করে বাঙালি জনগণ প্রথমে পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা সদর আসে। পরে তারা অজ্ঞাত স্থানে গিয়ে অবৈধ ভাবে বসতি গড়ে আর ফেরে না। এমন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বাঙালির সংখ্যা প্রতি মাসে এক হাজারের বেশি বলে ধারনা করা হয়।

দুই পর্বে বিভক্ত এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপি। এতে সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন আাদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস-এর আহবায়ক ফজলে হোসেন বাদশা এমপি। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রফেসর ও ডীন ড. আবদুল্লাহ আল ফারুকী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস এর সদস্য খালেদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি। এ পর্বটি সঞ্চালনা করেন আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস- এর টেকনোক্র্যাট সদস্য ও সমন্বয়ক প্রফেসর মেসবাহ কামাল।
মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপি পার্বত্য শান্তিচুাক্তির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন যে, বর্তমান শান্তি চুক্তি নিয়ে যে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা তাতে যৌক্তিকতা রয়েছে এবং এই চুক্তি বাস্তবায়নে সকলের সম্মিলিত প্রয়াস দরকার। যদিও চুক্তির পর ১৮ বছর অনেক সময় বলে মনে হয় তথাপি প্রকৃতপক্ষে চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে এটি অনেক কম সময়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মিজোরাম ও নাগাল্যান্ড চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ৬০-৬৫ বছর সময় লেগেছে। তিনি আরও বলেন, শান্তিচুক্তি হলো বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম চুক্তি তাই এটাকে খন্ডিত লড়াই হিসেবে নয় বরং জাতীয় আন্দোলন হিসেবে সামনে এগিয়ে নিতে হবে। এ ছাড়াও মন্ত্রী তার বক্তব্যে বাঙালিদের সংগঠন ‘সমঅধিকার আন্দোলন’র ভুমিকা পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করছে।
ফজলে হোসেন বাদশা এমপি তার বক্তব্যে পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে বাঙালিদের সচেতনতার প্রয়োজনীয়তার উপর বিশেষ গরুত্ব দেন।
প্রফেসর মেসবাহ কামাল বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তি হল ঐতিহাসিক ঘটনা। চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যকে সমুন্নত রাখার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার এবং এই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন একান্ত প্রয়োজন।

দ্বিতীয় পর্বে প্রধান বক্তা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় তথ্য মন্ত্রী জনাব হাসানুল হক ইনু এমপি এবং পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য শ্রী যতীন্দ্রলাল ত্রিপুরা এমপি। এতে সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস-এর সদস্য এ. কে. এম. ফজলুল হক এমপি। এছাড়া নির্ধারক আলোচক হিসেরব ছিলেন কবি কাজী রোজী এমপি, মিজ হাজেরা সূলতানা এমপি, নাজমুল হক প্রধান এমপি এবং টিপু সুলতান এমপি। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। উক্ত পর্বে সঞ্চালনা করেন আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস-এর টেকনোক্র্যাট সদস্য মিজ জান্নাত-এ-ফেরদৌসী ।
মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি বলেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সরকার এবং পার্বত্য প্রতিনিধিদের এক হয়ে কাজ করা প্রয়োজন। তিনি শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের পথে অন্যতম বাঁধা হিসেবে সাম্প্রদায়িক শক্তির কথা তুলে ধরেন, পাশাপাশি পার্বত্যাঞ্চলে নতুন করে যেন বাঙালি বসতি স্থাপন না হয় তার কথাও বলেন। তিনি নির্দিষ্ট সময়সূচিভিত্তিক একটি রোডম্যাপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
শ্রী যতীন্দ্রলাল ত্রিপুরা এমপি বলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন দ্রুত প্রণীত হওয়া দরকার। তিনি বর্তমান সরকারের উপর আস্থা জ্ঞাপন করে বলেন, শান্তি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন যদি হয় তাহলে এই সরকারের আমলেই হবে, অন্য কোন সরকার এলে যা স¤ভব নয়, এজন্য তিনি বর্তমান সরকারকে চুক্তি বাস্তবায়নে বিশেষ অনুরোধ জানান।
সঞ্জীব দ্রং শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পথে সকল বাঁধাকে অতিক্রম করার কথা বলেন এবং দেশটিকে আরও সুন্দর করা প্রসঙ্গে আদিবাসীদের সংস্কৃতি, ভাষাসহ সকল সমস্যাকে সমাধানের কথা বলেন। তিনি কাউকে হতাশ না হওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
সভাপ্রধানের বক্তব্যে এ. কে. এম. ফজলুল হক এমপি বলেন, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি আইন সম্পর্কিত সকল জটিলতার আশু সমাধান দরকার। চুক্তির বাস্তবায়নে টাইম ফ্রেম কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পোস্ট- ১ ডিসেম্বর ২০১৫