॥ বিহারী চাকমা ও সুপ্রিয় চাকমা শুভ ॥
জীব বৈচিত্রের জেলা আর বনবনানী ঘেরা পর্যটন শহর পার্বত্য রাঙামাটিতে সুদুর প্রসারী উদ্দেশ্য সামনে রেখে গড়ে ওঠা মিনি চিড়িয়াখানাটি কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা আর অব্যবস্থাপনার কারণে একেবারেই শ্রীহীন হয়ে পড়েছে।
জীব পরিবেশ, আনুসাঙ্গিক যত্ন, দর্শনের অযোগ্য এবং যতেœর অভাবে বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে এই চিড়িয়াখানায়। কথা বলে জানান গেছে, সেখানে নিয়োজিত কর্মচারীদের কেউই প্রাণীদের রক্ষণাবেক্ষণে অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত নন। আর এই অনভিজ্ঞতার কারণেই ইতোমধ্যে খাঁচায় জন্ম নেওয়া হরিণ শাবক মারা পড়েছে। এ অবস্থায় জেলা পরিষদ চিড়িয়াখানাটি বন্ধ করে সেখানে অন্য প্রকল্প করারও চিন্তা করছে বলে জানা গেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রে।
সময়ে সময়ে শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বের হাত বদল হলেও পরিবর্তন হচ্ছে না কিছুই। বরং নানাভাবে লোপাট হচ্ছে প্রাণীদের খাবার ও চিড়িয়াখানার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দের টাকা। চিড়িয়াখানাটির এমন বেহাল দশার জন্য জেলা পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যকেই দায়ী করেছে বিভিন্ন মহল।
জানা গেছে, বছরে ৬ লক্ষ টাকা ব্যয় দেখানো হচ্ছে তিনটি হরিণ, একটি ভালুক, চারটি বানর, তিনটি অজগর, দুইটি করে সজারু, কচ্ছপ ও টার্কি, পাঁচটি বনমোরগ, ও তিনটি খরগোসের খাবারের পেছনে। স্থানীয়দের অভিযোগ এই বিশাল বাজেটের বিপরীতে চিড়িয়াখানাটি এমন দশা হলেও বছর তিনেক আগেও মাসে মাত্র ১২ হাজার টাকা খরচেই প্রাণীকূল সুস্থ ও সবল ছিল।
তবে কোন অনিয়ম হচ্ছে না বলে দাবি করেন মিনি চিড়িয়াখানাটির তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য সাধন মনি চাকমা। তার দাবি নিজের সন্তানের মতোই দেখভাল করছি বলেই খাঁচার প্রাণীরা এখনও বেঁচে আছে’। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে চিড়িয়াখানায় উন্নতি হয়েছে। কোন প্রকার দুর্নীতি দেখিয়ে দিতে পারলে আমি রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্যপদ ত্যাগ করবো।
২০০২ সালে রাঙামাটি শহরের উপকন্ঠে ভেদভেদীর সুখী নীলগঞ্জ নামক স্থানে চিড়িয়াখানাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। শুরুতে এটি অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র হয়ে ওঠে রাঙামাটি শহরবাসীর। অবসরে বিনোদনপ্রেমীরা আসতেন এখানে।
বিশেষত পর্যটক, চাকরিজীবী, শিশু-কিশোরদের ভীড় লেগেই থাকতো। পর্যটন শিল্পেও অবদান রাখছিল।
কিন্তু বর্তমানে ধুঁকে ধুঁকে চলতে থাকা চিড়িয়াখানাটিতে এখন দর্শনার্থীও আসছেন না তেমন একটা। খাঁচার প্রাণীদের জন্য মায়া আর একবুক হতাশা নিয়ে ফিরছেন দর্শণার্থীরা। তাই ‘লোকসানি’ এ বিনোদনকেন্দ্রটিকে ‘গলার কাঁটা’ মনে করে ইতিমধ্যে প্রাণীগুলোকে অন্য চিড়িয়াখানায় বিক্রি করে দেওয়ার কয়েক দফা চেষ্টাও করে জেলা পরিষদ।
রাঙামাটি মিনি চিড়িয়াখানার জীবজন্তু ও প্রাণীদের দেখভালের দায়িত্বে কাগজেপত্রে রয়েছেন চারজন। এদের একজন রতœজীবন চাকমা সপ্তাহে দু’একবার চিড়িয়াখানায় আসেন। তাই যাবতীয় কাজ সামলান দারোয়ান শ্রবণ প্রতিবন্ধী নিরঞ্জয় চাকমা। আর নৈশ প্রহরী গুলমনি চাকমা ভালোভাবে হাটতে পারেন না; পক্ষাঘাতগ্রস্ত। খুব দরকার পড়লে অতি কষ্টে খুঁড়িয়ে গিয়ে কাজ সারেন।
রাঙামাটি মিনি চিড়িয়াখানাটিও অনেকটা গুলমনি চাকমার মতোই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দিন পার করছে। আর চিড়িয়াখানাটির মালিক রাঙামাটি জেলা পরিষদ যেনো নিরঞ্জয় চাকমারই প্রতিচ্ছবি; দর্শণার্থীদের চাহিদা আর খাঁচায় আটকা প্রাণীদের কোনো কষ্টই তাদের কানে পৌঁছে না। অবশ্য অন্যজনের নামই ভুলে গেছেন এই সহকর্মীরা !
সরেজমিনে দেখা গেছে, খাঁচাগুলোতে প্রাণীদের বিষ্ঠার স্তুপ পড়ে আছে। বিকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সামনে যাওয়াই দুষ্কর। চিড়িয়াখানায় প্রতিনিয়ত পরিত্যক্ত ও বাসী ফলমুল ও সব্জি সরবরাহ করার বেশ পুরনো অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। হরিণের খাঁচার মেঝেতে পড়ে আছে পুরোনো কলারছড়ি ও মিষ্টি কুমড়ার টুকরো। কলারছড়ি ও মিষ্টি কুমড়া রাখা হয়েছে; যেগুলো খাবার অনুপযোগী। ফলে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত খাবার-পানি না পেয়ে প্রাণীগুলোও দিন দিন দুর্বল, শীর্ণকায় ও শ্রীহীন হয়ে পড়েছে।
রোগাক্রান্ত প্রাণীদের জন্য চিকিৎসক নেই। ঠিকমতো ঔষুধ-টিকাও দেওয়া হয় না। দারোয়ান নিরঞ্জয় চাকমা বাজার থেকে ওষুধ এনে চিকিৎসা(!) দিচ্ছেন। আর প্রবেশপথের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের দেয়াল ভেঙ্গে পড়ে আছে বহুদিন ধরে। ভেতরে চারিদিকে আগাছাল জঙ্গলাকীর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অফিস ঘরটি অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা। এলোমেলো পড়ে আছে চেয়ার। টেবিলের ওপর স্থান হয়েছে রান্নার সরঞ্জাম, পাতিল ও বালতি।
চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসা নিকেল চাকমা ও জ্যাকসন চাকমা বলেন, ‘আরো নতুন প্রাণীর সংযোজন ও তাদের পর্যাপ্ত খাবার এবং চিকিৎসা দিতে হবে। চারপাশের নোংরা পরিবেশ চিড়িয়াখানাটিকে অস্বাস্থ্যকর করে তুলেছে। তদারকি ও জনবল না বাড়ালে এ দশার পরিবর্তন হবেনা। কর্তৃপক্ষ চাইলেই প্রাণ ফিরে পাবে চিড়িয়াখানাটি’।
অভিযোগ রয়েছে, এক জেলা পরিষদ সদস্য নিজের বিশেষ মানুষ অজিত চাকমার মাধ্যমে চিড়িয়াখানায় ফলমুল, সব্জিসহ অন্যান্য খাবার সরবরাহ করেন। এতে খাবারের জন্য বরাদ্দের অর্থের সিংহভাগই বেহাত হচ্ছে। অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করে দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য সাধন মনি চাকমা বলেন, ‘চিড়িয়াখানার ২৫টি প্রাণী ও পাশের দুইটি পুকুরের মাছের জন্য মাসে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ পাই। বাজারে মৌসুমি সবজির দাম চড়া, সবসময় পাওয়াও যায়না। এজন্য খাবারের কিছুটা সমস্যা হয়’। চিকিৎসার বিষয়ে বলেন, প্রাণীদের প্রয়োজন হলেই কেবল চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া হয়।
তবে চিড়িয়াখানার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘লোকসানের কারণে প্রাণীদের বিক্রি করে সেখানে অন্য প্রকল্প নেয়ার বিভিন্ন প্রস্তাব উঠলেও তা এখনও কার্যকর হয়নি। যাতায়াত ঘুরপথে হওয়ায় দর্শনার্থীও কম। ফলে নতুন করে কোন প্রাণী কেনার পেছনে অর্থ ব্যয় করারও সাহস পাচ্ছিনা’।
দায়িত্বে ফাঁকি দেয়া রতœজীবন চাকমা বলেন, ‘নিরঞ্জয়ের সাথে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিয়েছি। সাবেক চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমার সময়ে আমি খাবার কিনতাম। তখন প্রতিমাসে দেয়া ১২ হাজার টাকায় সব হতো, এখন ৫০ হাজারেও হচ্ছে না।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মনতোষ চাকমা বলেন, ২০০২ সালে ড. মানিক লাল দেওয়ান চেয়ারম্যান থাকাকালে মিনি চিড়িয়াখানাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। চিড়িয়াখানার জীবজন্তু ও চিড়িয়খানা সংলগ্ন মাছের পুকুরের জন্য প্রতিমাসে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।
তিনি জানান, প্রাণী সম্পদ বিভাগের কর্মচারী রতœজীবন চাকমাকে প্রেষণে চিড়িয়াখানায় ন্যস্ত করা হয়েছে। নৈশ প্রহরী গুল মনি চাকমা ও দারোয়ান নিরঞ্জয় চাকমা আছেন মাস্টাররোলে। অন্যজন মৎস্য খামারের দায়িত্বে আছেন’।