॥ আনোয়ার আল হক ॥
ধৈর্য্য আর অধ্যাবসায় যে মানুষকে সাফল্য এনে দেয়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেখলো রাঙামাটিবাসী। এবারই প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী পেয়েছে রাঙামাটির জনগণ। বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে আনা অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান প্রথমবারের মতো এমপি হয়েই পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন নতুন প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতায়। পূর্ণ মন্ত্রী পেয়ে উচ্ছ্বসিত রাঙামাটিবাসী। মঙ্গলবার মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর দীপেন দেওয়ানের নামের পাশে যুক্ত হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বইয়ে প্রশংসা আর কৃতজ্ঞতার ফুলঝুড়ি। একে অপরকে মিষ্টিমুখ করিয়ে আনন্দ উদযাপন করছে রাঙামাটির মানুষ।
রাঙামাটি জেলাবাসী তাদের ভালোবাসার প্রতিদান পেয়েছেন, তারা দুহাতভরে ভালোবাসার ডালি তুলে দিয়েছে বিএনপি চেয়ারম্যানের অনুকূলে, দেশের মধ্যে রেকর্ড সংখ্যক সর্বোচ্চ ভোটে নির্বাচিত করেছে ধানের শীষের কান্ডারী দীপেন দেওয়ানকে। তিনি ২লাখ ১হাজার ৮৪৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, যা দেশের জাতীয় নির্বাচনের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড। রাঙামাটিবাসীর এই ভালোবাসাকে মূল্যায়ন করতে কার্পণ্য করেননি নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে দীপেন দেওয়ান পেয়েছেন ধৈর্যের প্রতিদান; বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ধৈর্যের প্রতিদান পেয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও। তিনি ‘এক এগার সরকারের’ অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে নির্বাসিত জীবন যাপন করেছেন। ভাই মারা গেছেন, একনজর দেখতে পারেননি। মা অসুস্থ হওয়ার পর বিদেশ বিভূঁয়ে বসে চোখের পানি ফেলেছেন এক নজর দেখতে পারেননি। সর্বশেষ যখন দেশের মাটিতে তার পাশে আসতে পেরেছেন তখন মা কথা বলতে পারেননা। এতো ত্যাগ তিতিক্ষা উপেক্ষা করে পরম ধৈর্য্য আর অভিভাবকের মমতায় দলকে টিকিয়ে রেখেছেন শক্ত হাতে। কেন্দ্র, জেলা- উপজেলা অনেক ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের সাথেও যোগাযোগ রেখেছেন তাদের সাহস টিকিয়ে রাখতে। সেই কষ্ট এবার কেষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে তারেক জিয়ার হাতে। তিনি হয়েছেন দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী।
দীপেন দেওয়ানও একইভাবে কষ্ট করেছেন প্রায় দেড় যুগ। নিজের উজ্জল ভবিষ্যৎ জলাঞ্জলী দিয়ে তারেক জিয়ার এক কথায় জজ এর চাকুরী ছেড়ে এসে বিএনপির হাল ধরে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এক এগার সরকারের নির্বাচনী গ্যাঁড়াকলে পড়ে তিনি ২০০৯ সালে নির্বাচনের দৌড় থেকে ছিটকে পড়েন। এরপর ১৭ বছর তিনি মাটি কামড়ে পড়েছিলেন আজকের দিনটির প্রত্যাশায়। দলের জেলা পর্যায়ে সময়ে সময়ে তিনি অনেকটা নিগৃহীত হয়েছেন। নানাভাবে তাকে ছোট করা বা দলের তৎপরতা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছে অনেকই। কিন্তু তিনি সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করেছেন। একজন কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে নিজের মতো করে পালন করে গেছেন দলের প্রতিটি কর্মসূচি। অনেক সময় তৎকালীন কর্তৃত্ববাদী সরকারের রোষানল বা দলের দুষ্ট চক্রের ষড়যন্ত্রের মুখে দলীয় কার্যালয়ে আসতে পারেননি। তবু রাঙামাটি শহরের কলেজ গেইট এলাকায় তারপ্রতি আস্থা রাখা গুটি কয়েক নেতাকর্মীকে নিয়ে তিনি দলীয় কর্মসূচি পালন করে গেছেন। দল ছেড়ে কোথাওতো যানইনি, বরং দলের কোনো কর্মসূচি যাতে বাদ না পড়ে সে খেয়াল রেখেছেন সচেতন এবং যোগ্য নেতৃত্বের সাথে। ২০১৮ সালে বিএনপি অংশ নিলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেবার তিনি দলের মূল্যায়ন পাননি। অবশ্য পরে প্রমাণ হয়েছে সেই নির্বাচনটি ছিল এক নিষ্ঠুর প্রহসন, ‘যা দেশে বিদেশে রাতের ভোট’ নামে আখ্যায়িত হয়।
সেবর দল থেকে অবমূল্যায়িত হয়েও দীপেন দেওয়ান একটুও দমে যাননি বা থেমে থাকেননি। তবে তিনি যাকে আদর্শ মেনে তার ভবিষ্যৎ জলাঞ্জলী দিয়ে দল করার জন্য চলে এসেছিলেন, সেই প্রিয় নেতা তারেক রহমান এবার দেশে আসার পর আর তাকে হতাশ হতে হয়নি। দ্বীধাহীন চিত্তে তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন ধানের শীষ। তিনি হতাশ করেন নি প্রিয় নেতাকে, তাকে হতাশ করেনি রাঙামাটির ভোটারাও। এমনকি দলের নেতৃবৃন্দও এবার তার পাশে সার্বক্ষণিক থেকেছেন আন্তরিকভাবেই। যদিও এবার রাঙামাটি আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। কিন্তু এতে নির্বাচনী কার্যক্রমে কোনো শৈথিল্য প্রদর্শন করেনি রাঙামটির নেতৃবৃন্দ। ফল এসেছে হাতে হাতে, রাঙামাটিতে ভোটার উপস্থিতি নানা গুঞ্জন ও শঙ্কা থাকলেও সবাই দল বেঁধে গিয়ে তাকে ভোট দিয়ে এসেছেন। বলাই বাহুল্য শুধু তিনিই নন তার পিতাও বিএনপির রাজনীতিতে একজন পরীক্ষিত মানুষ ছিলেন, যে কারণে সুবিমল দেওয়ানকে নিজের উপদেষ্টা বানিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান।
এই সুবাদের রাঙামাটি শহরের কলেজ গেইটের পাশের তাদের এলাকাটির নাম মন্ত্রী পাড়া। মন্ত্রী পাড়ায় এতকাল কোনো মন্ত্রী না থাকলেও এবার সে অভাবটা ঘুচে গেলো। আক্ষরিক অর্থেই সত্য হলো মন্ত্রীপাড়ার নাম। গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার প্রথম প্রহরে বিএনপি সরকারের কাছ থেকে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী পেয়ে উচ্ছ্বসিত রাঙামাটিবাসী। মঙ্গলবার মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। পাহাড়ের অপর দুই জেলা খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এর আগে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী পেলেও এই প্রথম রাঙামাটি জেলা থেকে কোনো সংসদ সদস্য পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন।
১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পরের বছর ১৫ জুলাই পিছিয়ে পড়া পাহাড়ের মানুষের জন্য একটি বিশেষ মন্ত্রণালয় চালু করা হয়। তিন পার্বত্য জেলা নিয়ে সৃষ্টি করা হয় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়। শুরুতেই এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান খাগড়াছড়ি থেকে নির্বাচিত এমপি কল্পরঞ্জন চাকমা। পরে ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় বসার পর রাঙামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মনি স্বপন দেওয়ানকে উপমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এদিকে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠনের পর রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদারকে এই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। এরপর ২০১৪ সালে বান্দরবানের সংসদ সদস্য বীর বাহাদুরকে প্রতিমন্ত্রী এবং ২০১৯ সালে পুনরায় বীর বাহাদুরকে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে একতরফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবারো সরকার গঠন করার পর খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরাকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
রাঙামাটি সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মুজিবুল হক এক প্রতিক্রিয়ায় দৈনিক রাঙামাটিকে বলেন, দীপেন দেওয়ানের নেতৃত্বে আমরা গত ১৮ বছর ধরে সক্রিয় ছিলাম। তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর দুঃসময়ে দলের পাশে ছিলেন। তার এই ত্যাগ দল মূল্যায়ন করেছে। রাঙামাটিবাসী দীপেন দেওয়ানের নেতৃত্ব এবার এ জেলার উন্নয়ন সুষম করতে বদ্ধপরিকর।
এদিকে রাঙামাটি সংসদীয় আসনে বিএনপি’র নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ও সাবেক মেয়র সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ভূট্টো বলেন, আমাদের নেতা তারেক জিয়া পাহাড়বাসীকে মূল্যায়ন করেছেন, রাঙামাটির ভোটারদের ভালোবাসার প্রতিদান দিয়েছেন। দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটের ব্যবধানে আমাদের জয় উপহার দিয়েছে জনগণ। রাঙামাটির মানুষের সেই গণরায়কে স্বীকৃতি দিয়ে রাঙামাটিতে এই প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাঙামাটিবাসী তার কাছে কৃতজ্ঞ। দীপেন দেওয়ানও তার এই আস্থার প্রতিদান দেবেন। সহসা দীপেন দেওয়ানকে রাঙামাটিতে জাঁকজমকভাবে বরণ ও সংবর্ধনা প্রদান করা হবে। দীপেন দেওয়ান এ জেলার শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ এবং পর্যটন খাতকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করা যে প্রতিশ্রুতি জনগণকে দিয়েছিলেন আমরা তার বাস্তব প্রতিফলন দেখাবো ইনশাআল্লাহ।
এদিকে, প্রথমবারের মতো এই মন্ত্রণালয়ের দু’জনকে মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন পাশ্ববর্তী চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর হেলাল। তিনি অবশ্য বেশ কিছুদিন ধরে পাহাড়ের সাংগঠনিক তদারকির কাজটি করে আসছিলেন। তবে এই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী দেওয়ার বিষয়ে পাহাড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয় রয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। এটাকে কেউ ইতিবাচকভাবে দেখছেন কেউবা বিরক্তি প্রকাশ করে সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তুলছেন।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শিক্ষা, যোগাযোগ স্বাস্থ্য ও আর্থসামাজিক অবকাঠামোয় আক্ষরিক অর্থেই পিছিয়ে থাকা পাহাড়ি তিন জেলার মানুষ এবার দুহাত ভরে সকল ভালোবাসা নিগড়ে দিয়েছে বিএনপির প্রতি; কারণ তারা ১৭ বছরের বঞ্চনার অবসান চায়। পাহাড়ের মানুষ এমনিতেই বিএনপি ভক্ত একথা তারা বারবার প্রমাণ করেছে। ২০০১ সালেও তারা এর প্রমাণ দিয়েছে। সেবার পাহাড়ের তিনটি আসনের মধ্যে ২টি আসনই ধানের শীষের সরকারকে উপহার দিয়েছিল তারা। কিন্তু এক এগার সরকারের তেলেসমাতিতে ২০০৯ সালে পাহাড়ের মানুষ ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাছে হেরে যায়। এর পরে বিগত তিনটি নির্বাচনে ইতিহাস ছিল শুধুই নাটক মঞ্চস্থ করার মহড়া। সেখানে ভোটারদের মতামতের কোনো প্রতিফলন ঘটেনি।
এবার সুযোগ পেয়েই ভালোবাসার বন্যা বইয়ে দিয়েছে, কারণ বিগত ১৭ বছর যারা পাহাড়ে নেতৃত্ব দিয়েছে, তারা নিজেদের পকেট উঁচু করা ছাড়া সহজ সরল এই মানুষগুলোর কথা একটুও ভাবেনি। তাই উন্নয়নের সুরেলা গান মুখে মুখে ছড়ালেও কোনো ক্ষেত্রেই এগুতে পারেনি পাহাড়ের মানুষ।
ভালোবাসার প্রতিদান স্বরূপ এবার রাঙামাটি থেকে পূর্ণ মন্ত্রী যেমন দেওয়া হয়েছে, তেমনি খাগড়াছড়ি থেকে উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং বান্দরবান থেকে টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান পাবে এমন প্রত্যাশায় প্রহর গুনছে তারা। সময়ই বলে দেবে পাহাড়ের মানুষের প্রত্যাশা কতটুকু পরণ হয়।
Home এক্সক্লুসিভ প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী পেয়ে উচ্ছসিত রাঙামাটির মানুষ, নতুন দিনের প্রত্যাশা






























