ঢাকা ব্যুরো অফিস : ৯ জানুয়ারি ২০২৬, শুক্রবার
শামিমুল আহসান : নাট্যশিল্পী মো. এরশাদ হাসান। জাতীয় মঞ্চ নাটকে একক অভিনয়ের ক্ষেত্রে বর্তমান প্রজন্মের পুরুষ অভিনেতাদের মধ্যে প্রতিনিধিত্ব করছেন। গত ২১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ সন্ধ্যা ৭ টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে তার একক অভিনীত মঞ্চ নাটক ‘ভাসানে উজান’ এর উদ্বোধনী প্রদর্শনীর মাধ্যমে তিনি এর স্বক্ষর রাখেন।
ঢাকার মঞ্চ নাটকে একক অভিনয়ে পুরুষ শিল্পীদের মধ্যে মো. এরশাদ হাসানের আগে যাঁরা শিল্পগুণ প্রদর্শন করেছেন তার হলেন, ‘আমি’ নাটকে খন্দকার শাহ আলম, ‘শেখ সানি’ নাটকে এইচ আর অনিক, ‘কাঁদা মাটি’ নাটকে স্বরণ সাহা, ‘আই কান্ড ব্রিথ’ নাটকে মো. আবুল মনসুর ইতিমধ্যেই প্রসংসা পেয়েছেন।
দেশের মঞ্চ নাটকের ইতিহাসে একক অভিনয়ের পথিকৃৎ, মঞ্চ, টিভি ও চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী শ্রদ্ধাভাজন ফেরদৌসী মজুমদার এ নাটকের উদ্বোধন করেন। এ সময় নাট্যশিল্পী মো. এরশাদ হাসানকে উৎসাহিত করতে নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার ও ত্রপা মজুমদারও উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বর্তমানে রাষ্ট্রের প্রতিকুল পরিস্থিতিতেও টিকিট কেটে হলভর্তি দর্শকদের উপস্থিতি নাটকের গ্রহণযোগ্যতা প্রমান করে। এরিমধ্যে ‘ভাসানে উজান’ মঞ্চ নাটকটি দর্শক পূর্ণতায় চতুর্থ তম প্রদর্শনী করেছে।

নাটকের উদ্বোধক ফেরদৌসী মজুমদার অভিনেতা এরশাদ হাসানের অভিনয়ে সামান্য ত্রæটির কথা বললেও টেকনিক্যাল বিষয়ে সকলে প্রসংশাই করলেন। তাই বলা চলে বিবেকানন্দ থিয়েটারের ২৫তম প্রযোজনা ‘ভাসানে উজান’ নাটকটি সাম্প্রতিক সময়ের নতুন নাটকগুলোর মধ্যে একটি সফল প্রযোজনা। আর শিল্পাঙ্গনে মো. এরশাদ হাসান গুণি অভিনেতা হিসেবেও বেশ প্রসংশায় ভাসছেন। বিশ^খ্যত সাহিত্যিক দস্তয়ভস্কির ছোটগল্প ‘দ্য জেন্টেল স্পিরিট’ অবলম্বনে এর নাট্যরূপ দিয়েছেন অপূর্ব কুমার কুন্ডুর। প্রতিশ্রæতিশীল তরুণ নাট্য পরিচালক শুভাশীষ দত্ত তন্ময়ের নির্দেশনা নাটকটির নির্মাণের নেপথ্যে মঞ্চ ও আলোয়ক সজ্জায় ছিলেন- পলাশ হেন্ড্রি সেন, পোশাক পরিকল্পণায় এনাম তারা সাকি, আবহ সংগীত পরিকল্পণায় হামিদুর রহমান পাপ্পু, কোরিওগ্রাফি করেছেন রবিন বসাক, রূপসজ্জায় ছিলেন নাটকের নির্দেশক শুভাশীষ দত্ত তন্ময়।
মানুষের একাকিত্ব, মনস্তাত্বিক দ্ব›দ্ব, সমাজ দর্শণ নিয়ে রচিত ‘ভাষানে উজান’ নাটকটি অনুকরণে হলেও এ নাটকে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনারও আলোকপাত করা হয়েছে। নাটকে মো. এরশাদ হাসানের অভিনয় প্রজ্ঞার পাশাপাশি নাট্যকার ও নির্দেশকের মুন্সিয়ানার প্রমান রয়েছে।
মো. এরশাদ হাসান শিল্পাঙ্গনে অভিনয়ের পাশপাশি একজন দক্ষ প্রশিক্ষক ও সংগঠক হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত। মঞ্চ নাটক ছাড়াও পথনাটক, নির্বাক মঞ্চাভিনয় করেন। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের তালিকা ভূক্ত শিল্পী তিনি। দেশে এবং বিদেশে বৃহৎ শিল্পকর্মের সমন্বয়ক, নাট্যদলের আর্টিস্টিক ম্যানেজার হয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। সেীখিন ন্যাচার ফটোগ্রাফার হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে।
এরশাদ হাসানের মঞ্চাভিনয় শুরু হয় প্রায় দুই দশকের আগে থিয়েটার স্কুলের বছর মেয়াদী সার্টিফিকেট কোর্সের অংশগ্রহণের মধ্য। নাট্য প্রযোজনার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে নাট্যাঙ্গনে পরিচিতি পান এরশাদ হাসান। গত দুই দশক বরেণ্য নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার পরিচালিত থিয়েটার নাট্যদলের সদস্য ও নাট্যকর্মী হিসেবে বিভিন্ন নাটকের অভিনয় ও সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন।
অভিনয় ও সাংগঠনিক যাত্রাপথে ড. ফরহাদ জামান পলাশ নির্দেশিত স্যামুয়েল বেকেটের ‘এন্ড গেম’ এর অনুবাদে ‘শেষখেলা’ নাটকের পোশাক পরিকল্পনা, মঞ্চ ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োগ করেছেন এরশাদ হাসান। এরপর গিরিশ কারনাডের রচনায়- আশীষ গোস্বামীর অনুবাদে, রামেন্দু মজুমদারের নির্দেশনায় ‘মাধবী’ নাটকে রাজসেবক, শিল্পকলা একাডেমির রেপার্টরি নাট্য প্রযোজনা, গোলাম সারোয়ার নির্দেশিত ‘ক্ষেতমজুর খৈমুদ্দিন’ নাটকে রহমত, থিয়েটার প্রযোজিত আব্দুল্লাহ আল মামুনের রচনা ও নির্দেশনায় ‘মেরাজ ফকিরের মা’ নাটকে গ্যাদা ফকিরের চৌকষ চ্যালা হেকমত, শিল্পকলা একাডেমির রেপার্টরি নাট্য প্রযোজনা আতাউর রহমান নির্দেশিত ‘রুদ্র রবি ও জালিয়ান ওয়ালাবাগ’ নাটকে ব্রিটিশ মেম্বার, দাদা ঠাকুর ও সঞ্জয়রূপত্রয় চরিত্রে থিয়েটার প্রযোজিত এবং ত্রপা মজুমদার নির্দেশিত ‘বারামখানা’ নাটকে লালন সাঁইয়ের প্রধানতম শিষ্য শীতল সাঁই, নায়লা আজাদ নূপুর নির্দেশিত ও থিয়েটার প্রযোজিত ‘মুক্তধারা’ নাটকের রাজকুমার সঞ্জয় চরিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি নাটকটির সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বেও ছিলেন। জাপানের উচিমূরা পদকপ্রাপ্ত, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির রেপার্টরি প্রযোজনা ‘একশ বস্তা চাল’ নাটকের বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

তিনি বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত অভিনয়শিল্পী, এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি টিভি চ্যানেলে প্রচারিত টিভি নাটকের নিয়মিত অভিনয়শিল্পী। একুশে টিভির মেগাধারাবাহিক ‘ললিতা’ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র চাচাতো ভাই শরীফুল এবং বিটিভিতে প্রচারিত ধারাবাহিক ‘রং তামাশ’ নাটকে অন্যতম একটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। মাছরাঙা টেলিভিশনে ধারাবাহিক নাটকে পাচক চরিত্র, বৈশাখী টিভিতে প্রচারিত ‘বাবার বাড়ি’ একুশে টেলিভিশনের ধারাবাহিক ‘টাট্টু ঘোড়া’সহ নির্মাণাধীন কয়েকটি নাটকে অভিনয় করছেন।
নাট্যঙ্গনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে তার নিজের লেখা নাটকের বই প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন। নিজের লেখা কবিতাগুচ্ছ নিয়ে একটি কবিতার বই প্রকাশেরও ইচ্ছে আছে বলে জানান। এ ছাড়াও বাংলাদেশের প্রকৃতি নিয়ে তাঁর তোলা একশত নির্বাচিত আলোকচিত্র নিয়ে ‘আমার চোখে আমার বাংলা’ অ্যালবামগ্রন্থ খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি নিজস্ব আলোকচিত্র নিয়ে একক প্রদর্শনীর পরিকল্পনাও রয়েছে তার। তিনি ফটোগ্রাফির দেশ-বিদেশে মর্যাদাপূর্ণ তিনটি সংগঠন- বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (বিপিএস), ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনাল আর্ট ফটোগ্রাফি (ফিআপ) এর আজীবন সদস্যপদ এবং লিজেন্ডারি মোমেন্ট ফটোগ্রাফি সোসাইটি (এলএমপিএস) এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।
চাকুরির সুবাদে এরশাদ হাসান বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির একাধিক গ্রন্থ সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পাপেট থিয়েটারের জাতীয় উৎসব বাস্তবায়নে সক্রিয় ছিলেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রকাশিত দেশের প্রথম পাপেট-ভিত্তিক গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের পুতুলনাট্য: ঐতিহ্যবাহী শিল্পধারার নবজাগরণ’ এর সম্পাদনার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। সাংগঠনিক দক্ষতায় তিনি নিজ কর্মস্থল বাংলাদেশ শিল্পকল একাডেমির ‘জেলা কালচারাল অফিসার্স ফোরাম’ এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

একজন দক্ষ অভিনয়শিল্পী হিসেবে মো. এরশাদ হাসান দেশ-বিদেশের ভিবিন্ন সংস্থা, সংগঠন থেকে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তার মধে- বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও ঢাকাস্থ জাপানী দূতাবাসের যৌথ প্রযোজনায় ‘একশ বস্তা চাল’ নাটকের অভিনেতা হিসেবে ‘আন্তর্জাতিক উচিমূরা গ্রæপ পুরস্কার-২০০৮, হিরণ কিরণ নাট্য পদক- ২০২৪, অনুরাগ স্টার সম্মাননা- ২০২৫, টেলিভিশন রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ট্র্যাব) প্রবর্তিত ‘ট্র্যাব স্টার অ্যাওয়ার্ড- ২০২৫, সুন্দরবন পর্যটন ক্লাব সম্মাননা-২০২৫, বিসিআরএ অ্যাওয়ার্ড ২০২৫, বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
লেখক- ঢাকা ব্যুরো প্রধান, দৈনিক রাঙামাটি




























