॥ আনোয়ার আল হক ॥
সুন্দর আগামীর প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হলো নতুন বছর ২০২৬। অনেক আনন্দ-বেদনা, পাওয়া-না পাওয়া, হাসি-কান্নার নানা ঘটনা আর কথামালার জালে জড়ানো ২০২৫ বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর জন্য ছিল একটি ঘটনাবহুল বছর। তবে ২০২৫ এর শেষ দিনটি ছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি স্মৃতিবহ বিষাদময় দিন। শেষ দিনটি যেমন ছিল বেদনা বিধুর, তেমনি অনিশ্চয়তার পথে যাত্রার হাতছানি। কারণ এই দিন অন্তিম শয়নে চলে গেছেন বর্তমান সঙ্কটময় সময়ে সকলের আস্থার প্রতীক ও বাংলাদেশপন্থী মানুষের অভিভাক, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও তিনবারের রাষ্ট্রনায়ক বেগম খালেদা জিয়া। ভঙ্গুর হৃদয়ে জাতি তাঁকে শেষ বিদায় জানিয়েছে।
৩০ ডিসেম্বর তার মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। যেখানে ছিল দেশের মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের এক মহান রাজনীতিকের ইতিহাস। যিনি মানুষের কল্যাণে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।
তবু আজকের নতুন সূর্য পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে নতুন বছর। এ বছরটিও বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে; সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় নিমগ্ন হবে দেশের মানুষ। তবু নানা কারণে ঘটনাবহুল ২০২৫-এর দিকে বারবার ফিরে তাকাবে তাকাবে ইতিহাস।
বিদায়ি বছরটি সবার জীবনেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২০২৫ একটি ঘটনাবহুল বছর। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে চড়াই-উতরাই আর নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গেছে পুরো দিনগুলো।
বিদায়ি বছরে আরেক আলোচিত ঘটনা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা। অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা করে, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণ-অভুত্থানে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর দেশে রাজনীতির আলোচনার মূল কেন্দ্রতেই ছিল এই নির্বাচন। এই নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এটি কতটা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হবে তার দিকে তাকিয়ে আছে দেশের মানুষ ও সারাবিশ্ব।
ঘটনাবহুল ২০২৫ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, গণআন্দোলন, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের রদবদল ও জাতীয় জীবনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হয়েছে বিদায়ী বছরটি।
২৪ এর বর্ষা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে নতুন বন্দোবস্তের আকাক্সক্ষা নিয়ে গঠিত নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুস এর অন্তর্বর্তী সরকার একেবারে খাদের কিনারা থেকে দেশকে টেনে আনতে গিয়ে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার বিটার ফারাক সত্ত্বেও অন্তত অর্থনীতির পতন থেকে রক্ষা করেছেন। ফ্যাস্স্টি সরকারের সময়ে নানা অনৈতিক ও বেআইনী তৎপরতার জড়িয়ে যাওয়া পুলিশসহ শৃঙ্খলা বাহিনী মনবল বিপর্যস্ত থাকায় যদিও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বারে বারে নানা অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তবুও দেশের মানুষ ধৈর্য্য ধারণ করেছে সংস্কারের মাধ্যমে নতুন আগামী গড়ার মহান প্রত্যয়ে।
সারা বছরই দেশজুড়ে কর্মচারী, ছাত্র, শ্রমিক আন্দোলনের নামে পরিস্থিতি যেভাবে অস্থিতিশীল করার এক নীল নকশা বাস্তবায়নের ক্রীড়ানকে পরিণত করা হয়েছে সাধারণ মানুষকে। সেই প্রেক্ষাপটে সাধারণ শৃঙ্খলা ধরে রাখাও কঠিন ছিল। বছরের শেষ লঙ্গে এসে ইনকিলাব মঞ্চের ওসমান হাদীর মৃত্যু জাতিকে কঠিন নাড়া দিয়ে গেছে।
২০২৫ সালেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যার অন্তত একটি রায় সম্পন্ন করেছে। যে রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিগত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দন্ড ঘোষণা করা হয়েছে।
বিদায়ী বছরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর তার দেশে ফেরা দেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দেয় এবং দেশের রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করে।
রাজনীতির পাশাপাশি বিদায়ী বছরটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকেও ছিল চ্যালেঞ্জপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি খাতে ঘুরে দাঁড়ানোর আভাসও দেখা যায়।
বছরের মেষ লগ্নে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে প্রবল ভূমিকম্পে ঘটনা বাদ দিলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের দিক থেকেও ২০২৫ সাল ছিল সতর্কতার বছর। ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয়তা প্রশংসিত হয়।
খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ ছিল সক্রিয়। ক্রীড়াঙ্গনে তরুণদের সাফল্য আশার আলো দেখিয়েছে, আর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে শান্তিরক্ষা ও মানবিক ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল ছিল পরিবর্তন, শোক, প্রত্যাশা ও পুনর্গঠনের বছর। নতুন বছর ২০২৬ ঘিরে দেশের মানুষের প্রত্যাশা—স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।




























