রাজস্ব প্রদানে সেরাদের সম্মানসূচক ‘সি এইচ টি ট্যুরিজম অ্যাওয়ার্ড’ প্রদানের উদ্যোগ বাস্তবায়নে খোঁজ : ব্যবসা আছে লাভ নেই রাঙামাটির পর্যটনশিল্পে : ইস্যু সাম্প্রদায়ীক ও আঞ্চলিক রাজনীতি

437

ঢাকা ব্যুরো অফিস : ১৪ অক্টোবর, ২০২৪

শামিমুল আহসান :
স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায় থেকে পার্বত্য চট্টগামের পর্যটনশিল্পর উন্নয়নে ব্যবসার ক্ষেত্রে ট্যুরিজমশিল্পের আওতায় বিবেচিত যেমন : সড়ক পরিবহন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, লঞ্চ/জলযান পরিবহন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট-রেস্তরাঁ, বার, পিকনিক স্পট, সুইমিং পুল, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র ইত্যাদির মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায় রাজস্ব প্রদান করে যারা দেশের রাজস্ব খাতকে সমৃদ্ধ করছেন, এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে মনোনিত প্রতিষ্ঠান/ব্যাক্তিকে সম্মান জানাতে দৈনিক রাঙামাটি পত্রিকা ও সুন্দরবন পর্যটন ক্লাব’র পক্ষ থেকে যৌথভাবে জাতীয় পর্যায়ে ‘সি এইচ টি ট্যুরিজম অ্যাওয়ার্ড’ প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়।
এ ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন, পর্যটনশিল্পে রাজস্ব (ভ্যাট/ট্যাক্স) প্রদানে এগিয়ে কে বা কারা ? যদি সম্মান জানাতে হয় কাকে দেয়া হবে সে সম্মান ? এরি পরিপেক্ষিতে অনুসন্ধানে নেমে অবাক হতে হয় যে, পার্বত্য চট্টগামের পর্যটনশিল্প কোনটি ? কারাইবা এই শিল্পের সেবক ?

এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে প্রতিয়োমান হয় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের পর্যটনশিল্প ঘিরে রাজস্ব প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে একদিকে সরকার বিপুল পরিমান রাজস্ব হারাচ্ছে। অপর দিকে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পাহাড়িরা উপজাতি নাকি বাঙালি ? এবং পার্বত্য চুক্তি বা শান্তিচুক্তির পরে ২০০৬ সালে ১/১১ পর জাতিসংঘ আরোপিত আদিবাসি দাবির ইস্যুতে উত্তাল হওয়া আঞ্চলিক রাজনীতিকে পুঁজি করে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে প্রতি বছর গ্রাহকদের কাছ থেকে নেয়া শত শত কোটি টাকার ভ্যাট রিটার্ন ও আয়কর ফাঁকি দেয়ার ঘটনা ঘটাচ্ছেন। তবে শুভংকরের ফাঁকির এই পর্যটন খাত থেকে প্রতি বছর কি পরিমান রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হচ্ছে তা আমাদের পক্ষে সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্টানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকেও এ বিষয় সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। তাই, দৈনিক রাঙামাটি পত্রিকার পক্ষ থেকে এ বিষয় ধারাবাহিক অনুসন্ধানি প্রতিবেদন প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ কার্যক্রমের প্রথম পর্বে রাঙামাটি পার্বত্য জেলার উপর অনুসন্ধানি প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হলো।

প্রিয় পাঠক প্রকাশিত প্রতিবেদনে কোন তথ্যের ভুল থাকলে বা ব্যক্তিগত আক্রশমূলক তথ্য প্রকাশিত হয়েছে মনে হলে- এ বিষয় দৈনিক রাঙামাটি পত্রিকার সম্পাদক বরাবরে লিখিত আবেদনের মাধ্যমে জানালে যথাযথ নিয়মে গুরুত্বসহ তা দৈনিক রাঙামাটি পত্রিকাসহ অনলাইন ভার্ষণে প্রকাশ করা হবে।

 

আমাদের উদ্যোগ এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট :
দেশে টেকসই পর্যটনশিল্প উন্নয়ন এবং সরকারের বিউটিফুল বাংলাদেশ বিনির্মণে সহায়ক হয়ে পার্বত্য চট্টগামের পর্যটনশিল্প উন্নয়নে রাজনৈতিক কারণে পিছিয়ে পড়া রাঙামাটিকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে নিজস্ব উদ্যোগে দৈনিক রাঙামাটি পত্রিকা ২০১৪ সাল থেকে জতীয় পর্যায় প্রচার-প্রচারনার কাজ চালিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি এই কার্যক্রমকে আরো ব্যপকভাবে ছড়িয়ে দিতে ২০২৩ সালের শেষের দিকে ‘সুন্দরবন পর্যটন ক্লাব’র সাথে যৌথ উদ্যোগে জাতীয় পর্যায়ে ‘সি এইচ টি ট্যুরিজম অ্যাওয়ার্ড’ প্রচলন করার পরিকল্পণা গ্রহণ করা হয়। পরিকল্পণা মতে এ বছর ৩রা জুন ২০২৪ তারিখ সোমবার, জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে এ সংক্রান্ত প্রথম অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ‘পার্বত্য নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটনশিল্প উন্নয়নের নিয়ামক’- শীর্ষক আলোচনা ও ‘পার্বত্যভূমির পথেপ্রান্তরে ও একটি উপন্যাসের সন্ধানে’ গ্রন্থের লেখক একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশ^বরেণ্য কথাসাহিত্যিক ড. সেলিনা হোসেনকে সংবর্ধনা প্রদান করে ‘সি এইচ টি ট্যুরিজম অ্যাওয়ার্ড’ প্রচলনের কর্যক্রম শুরু করা হয়। আয়োজকদের দাবি হচ্ছে, গ্রন্থ দুটির লেখক তার পর্যটনপ্রিয় পাঠকদের পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রমণে আকৃষ্ট করে তিন পার্বত্য জেলার পর্যটনশিল্প উন্নয়নে যথেষ্ট অবদান রেখেছেন।


এছাড়াও বিভিন্ন ক্ষেত্রে পর্যটনশিল্প উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য এ অনুষ্ঠানে অন্য যারা ‘সি এইচ টি ট্যুরিজম অ্যাওয়ার্ড’ পান তাঁদের মধ্যে প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে- পার্বত্য চট্টগ্রম উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে সংবর্ধিত ব্যক্তি ড. সেলিনা হোসেনসহ অন্যরা হলেন, পর্যটনশিল্প উন্নয়নে নির্র্মিত ও প্রচারিত দেশের প্রথম প্রামান্যচিত্র ‘ভিজিট বাংলাদেশ’ পরিচালনার জন্য জামিউর রহমান লেমন, ‘ভিজিট বাংলাদেশ’র ধারা বর্নণা রচনা ও সার্বিক তত্ত¡াবধানের জন্য বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন সাবেক মহাব্যবস্থাপক, অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ, পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটনশিল্প উন্নয়নে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে দৈনিক গিরিদর্পণ সম্পাদক- আলহাজ্জ্ব এ কে এম মকসুদ আহমেদ, ফটো সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে জাতীয় প্রেসক্লাব সদস্য ও দৈনিক আমাদের বার্তার ফটো এডিটর- বুলবুল আহমেদ, পার্বত্য চট্টগ্রামে শিল্প-সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে রাঙামাটি জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাবেক পরিচালক- মুজিবুল হক বুলবুল, পর্যটনশিল্প উন্নয়নে জাতীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক দক্ষতা ও ব্যবসায়ীক ক্ষেত্রে ‘ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব)’ এর সভাপতি- শিবলুল আজম কোরেশী।
দৈনিক রাঙামাটি পত্রিকার প্রকাশক মো. জাহাঙ্গীর কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্টানের প্রধান অতিথি ছিলেন- পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সাবেক সভাপতি, সাবেক এমপি দীপংকর তালুকদার। বিশেষ অতিথি ছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মো: মশিউর রহমান এনডিসি, সেতু বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত সচিব, বিশিষ্ট সংবাদ উপস্থাপক ও আবৃত্তিশিল্পী দেওয়ান সাঈদুল হাসান। প্রধান আলোচক ছিলেন, একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য আবৃত্তিশিল্পী ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনিষ্টিটিউটের অধ্যাপক রূপা চক্রবর্তী। আলোচক ছিলেন, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাবেক তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. বেলায়েত হোসেন, বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পণা সমিতির (এফপিএবি) ট্রেজারার- রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান, দৈনিক রাঙামাটি পত্রিকার ইভেন্ট উপদেষ্টা- মো. কামরুজ্জামান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চলনায় ছিলেন, দৈনিক রাঙামাটি পত্রিকার সম্পাদক- আনোয়ার আল হক ও সংস্কৃতিজন ত্রিমুনি খান। সাংস্কৃতিক পর্ব পরিচালোনা করেন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সংগীতশিল্পি ও সংগীত শিক্ষক বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রী সমর বড়–য়া।

লক্ষ্য বাস্তবায়নে যাত্রা :
সি এইচ টি ট্যুরিজম অ্যাওয়ার্ড প্রচলন অনুষ্ঠানটি শেষ করে মূল অ্যাওয়ার্ড প্রদানের জন্য পরবর্তি অনুষ্ঠান আয়োজনের লক্ষে ক্যাটাগরি অনুযায়ী রাজস্ব প্রদানকারী অ্যাওয়ার্ড পার্সনের খোঁজে আমাদের অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয় পার্বত্য জেলা রাঙামাটির রাজস্ব অফিস থেকে। কিন্তু সেখান থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ওই অফিসের কর্মকর্তা জানালেন, হেড অফিস থেকে এ তথ্য নিতে হবে, অথবা হেড অফিস অনুমতি দিলে পরে তারা এ তথ্য দিতে পারেন। এর পর আমাদের অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয় জাতীয় রাজস্ব ভবন থেকে। ভবনের গেইট থেকে পরামর্শ নিয়ে কিছুটা ঘোরা-ঘুরি করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ চারিতায় জানা গেলো, পর্যটন খাত থেকে কি পরিমাণ রাজস্ব আদায় হয়- আলাদা করে তার কোনো হিসাব কেন্দ্রে থাকে না। এখন পর্যন্ত এমন কোনো রেওয়াজও তৈরি হয়নি। তবে আমাদের কার্যক্রমের জন্য অন্তত রাঙামাটি জেলার পর্যটন খাত থেকে সরকারের তহবিলে কি পারমাণ রাজস্ব আসে তার একটা ফিরিস্তি চাইলে তাদের পরামর্শে ঢাকা থেকে গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখ, চট্টগামের আগ্রবাদে অবস্থিত রাজস্ব অফিসের কর অঞ্চল রাঙামাটি জোন অফিসে যাওয়া হয়। এ অফিসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ফরহাদ রহমানের সাথে দেখা করলে তিনি এ বিষয় কোনো প্রকার সহযোগিতা করায় অপারগতা জানিয়ে তার উর্ধোতন কর্মকর্তার কাছে যাবার পরামর্শ দেন। পরে এ অফিসের উর্ধোতন কর্মকর্তা- ডেপুটি কমিশনার (তৎকালীন) রোখসানা খান (রাজস্ব বিভাগ রাঙামাট) এর কাছে গেলে তিনি আমাকে সাক্ষাত না দিয়ে তার অধিনস্ত এ অফিসের অন্য কর্মকর্তা (তৎকালীন) মো. হাফিজুর রহমান খানের কাছে পাঠান। চা চক্রের আলাপ চারিতায় তিনি জানালেন, মূলত: তাদের কাছেও পর্যটন বিষয়ে আলাদা করে ভ্যাট-ট্যাক্সের কোনো তথ্য থাকে না। রাঙামাটি থেকে বা জেলাওয়ারি আলাদা অফিস থেকে এ তথ্য নিতে হবে। পরের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে, সরকারী বিশেষ ছুটি (জন্মাষ্টামী) থাকায় অপেক্ষা করে তার পরের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে, রাঙামাটির ভেদভেদি রাজস্ব অফিসে গিয়ে যথা সময়ে এ অফিসের কর্মকর্তাকে না পেয়ে সময়গুণে ঢাকা ফেরার তাগিদ আসে। ফলে এ যাত্রায় আর জানা হলোনা রাঙামাটিতে পর্যটন খাতে ভ্যাট-ট্যাক্স প্রদানে কে সেরা, আর কে ফাঁকিবাজ। পাঠক, এ যাত্রায় ব্যর্থ হলেও পরবর্তি পদক্ষেপে জানাতে পারবো রাঙামাটি তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন খাত থেকে সরকার কি পরিমাণ রাজস্ব আদায় করে। তবে যতটা জানা গেছে-


সার্বিক বিবেচনায় রাঙামাটির পর্যটনশিল্প প্রতিষ্ঠান বলতে রাঙামাটি জেলা সদরের তবলছড়িতে অবস্থিত সরকারী সংস্থা বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের- পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স, জেলা সদরে অবস্থিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত- অরন্যক রিসোর্ট, বাঘাইছড়ি থানার সাজেকে অবস্থিত সাজেক ভ্যালী রিসোর্ট ও রুই লুই রিসোর্ট, কাপ্তাইয়ে বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর পিকনিক স্পট, জেলা সদরের ডিসি বাংলো সড়কে অবস্থিত বাংলাদেশ পুলিশের ‘পলওয়েল কটেজ ও পলওয়েল পাকর্’ ছাড়া রাঙামাটির অন্য কোন প্রতিষ্ঠান পর্যটনশিল্প হিসেবে সরকারকে রাজস্ব দেয় তা জানা সম্ভব হয়নি। শতভাগ পর্যটন অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত থাকলেও রাঙামাটির বেসরকারী পর্যায়ে যেসব প্রতিষ্ঠান পর্যটন সেবায় নিয়োজিত থেকে ব্যবসা করছে তাদের কাছ থেকে রাঙামাটির রাজস্ব অফিস যে পদ্ধতিতে ভ্যাট-ট্যাক্স সংগ্রহ করছে তা মুলত: সাধারণ ব্যবসা হিসেবে থোক পদ্ধতির কার্যক্রম। এতে করে পর্যটন প্রতিষ্ঠান আর কলা-কচুর ব্যবসা প্রতিষ্টানের মধ্যে কোনো তফাত থাকছে না। অথচ- পর্যটন করপোরেশন তাদের পর্যটন সেবায় পর্যটক শ্রেণীর গ্রাহকদের কাছ থেকে যে পরিমাণ মূল্য নির্ধরণ করে থাকে তার প্রায় সমপরিমাণ মূল্যে রাঙামাটির বাজার ফান্ড কর্তৃপক্ষ বেসরকারী পর্যায়ে সেবামূল্য নির্ধারণ করলেও ভ্যাট-ট্যাক্স নির্ধারণের ক্ষেত্রে তা সাধারণ। কারণ, পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনীতি এবং সাম্প্রদায়ীক নানান ইস্যূতে এখানকার বেসরকারী পর্যায়ের পর্যটক ব্যবসায়ীরা বিশাল পরিমানের লস গুণে থাকেন। তাই সারা বছরের ভ্যাট-ট্যক্স ফাঁকির ইস্যূভিত্তিক শুভংকরের ফাঁকি চলে। জাতীয় এবং স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম থেকে যে সংবাদ জানাযায়- তাতে দেখাগেছে, পর্যটন মৌসুমে রাঙামাটির পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স প্রতিদিন ৪/৫ লক্ষ টাকা আয় করে থাকে। অবশ্য এটি গড় আয় নয়। আর সাজেকের বেসরকারী পর্যায়ের ব্যবসা থেকে পর্যটন মৌসুম বাদে বছরের অন্য সময় দুই/তিন দিনের ছুটিতে শুধু হোটেল রেস্টুরেন্ট-রেস্তরাঁ ব্যবসায় প্রায় ২.৫ থেকে ৩ কোটি টাকা নীট মুনাফা হয়।
সরকারী পর্যায়ে ভ্যাট-ট্যাক্স প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পর্যটন করপোরেশনের হেড অফিসের হিসাব শাখার দেয়া তথ্য মতে, রাঙামাটির পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স- হোটেল, মোটেল, কটেজ ও ঝুলন্ত ব্রিজ সবমিলে গত ২৩-২৪ অর্থ বছরে ৫ কোটি ৩১ লক্ষ ৪২ হাজার মোট মুনাফার বিপরিতে ৭০ হাজার পাঁশত টাকার বেশি ভ্যাট প্রদান করেছে। ট্যাক্স দিয়েছে ২৩ হাজার ৯ শত ৪৮ টাকা। এ সময় খাগড়াছড়ি পর্যটন হোটেল মোট মুনাফা করেছে ৭২ লক্ষ ৪৭ হাজার টাকা। ভ্যাট দিয়েছে ৭ লক্ষ ৪৩ হাজার পাঁশত টাকা। কোনো ট্যাক্স প্রদান করেনি। আর বান্দরবান পর্যটন হোটেল মোট মুনাফা করেছে ১ কোটি ৫ লক্ষ ৩৪ হাজার টাকা। ভ্যাট দিয়েছে ৮ লক্ষ ৯৪ হাজার টাকা। ট্যাক্স প্রদান করেছে ৪৭ হাজার টাকা।
এদিকে অবাক করা কান্ড রাঙামাটি জেলা সদরে নামী-দামী অর্ধশতেরও বেশি বেসরকারী আবাসিক হোটেল রয়েছে, যেখানে পর্যটকরা সেবা নিয়ে থাকেন। অথচ মাত্র দুটি হেটেলের নামে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছড়পত্র রয়েছে বলে জানাগেছে। প্রশ্ন ওঠে- তাহলে রাঙামাটিতে আগত হাজার হাজার পর্যটকরা কোন পরিবেশে থাকছেন ?
পরিবহন সেবার মাধ্যমে পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারেরও বেশী পর্যটক রাঙামাটি সদরে যাতায়াত করে থাকেন। কিন্তু রাঙামাটি জেলা সদরের ভ্যাট অফিস পরিবহন খাত থেকে কোনো ভ্যাট-ট্যাক্স আদায় করেনা। এ ক্ষেত্রে ভ্যাট-ট্যাক্স আদায় করা হয় রাজধানী ঢাকা অথবা চট্টগ্রাম থেকে। ফলে পর্যটকদের কাছ থেকে নেয়া ভ্যাট ফাঁকির বড় ঘটনা ঘটছে।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক ট্যুর অপারেটর (টোয়াব সদস্য) এ প্রতিবেদককে জানান, তারা পর্যটকদের গ্রুপ  টিম নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে যাতায়াতে পরিবহনসহ সবক্ষেত্রে পাওনার পুরো টাকা অগ্রিম পরিশোধ করে থাকেন। রাজস্ব খাতে তার হিসাব কি ভাবে হয় তা নিয়ে কোনো দিন তারা ভাবেননি। সাধারণ ভাবে যারা গ্রæপট্যুর করেন, তারা এসবের কোনো গুরুত্ব দেননা। ফলে এক্ষেত্রে সরকার কোনো রাজস্ব পায় কিনা তা সন্দেহ জনক। তবে ২৩-২৪ অর্থ বছরে বাজেটে অর্থ মন্ত্রণালয় ট্যুর অপারেটদের আয়ের উপর ১৫% বাধ্যতামূলক ভ্যাট আরোপ করায় ট্যুর অপারেটদের রেজিস্টার সংগঠনগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। ট্যুর অপারেটদের দাবী তার গ্রæপ ট্যুরে পর্যটকদের কাছ থেকে নেয়া ধার্যকৃত খরচের মধ্যে সল্প পরিমাণের আয় নির্ধারণ করে থাকেন। সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান ভেদে তা ১০ থেকে ১৫%। ট্যুর অপারেটদের দাবী তারা গ্রæপ ট্যুরে ধার্যকৃত নির্ধারি মূল্য থেকে যাতায়াত, খাবার ও আবাসিক খরচ মেটাতেই ভ্যাট পরিশোধ থাকে। নতুন করে ট্যুর অপারেটিং-এ ভ্যাট নির্ধারণ করা হলে তা হবে একই পণ্যে দুই বার ভ্যাট দেয়ার মত অযৌক্তিক ঘটনা। জানাগেছে, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড এ বিষয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ট্যুর অপারেটিং-এর ক্ষেত্রগুলোতে ক্রয় রশিদ থাকলে আলাদা করে আর ভ্যাট দিতে হবেনা।
বেসরকারী পর্যায়ে গড়ে ওঠা রাঙামাটির হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টে পর্যটকসহ যে কাউকে অবস্থান করতে হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১১দফা নির্দেশনা মেনে হোটেলের এন্ট্রি বুকে সঠিক ভাবে সব তথ্য দিয়ে স্বাক্ষর করতে হয়। কিন্তু হোটেলের রুম ভাড়া কত ? এন্ট্রি বুকে তার উল্লেখতো থাকেই না, রশিদও দেয়া হয়না। অপর দিকে রেস্টুরেন্ট-রেস্তোরাঁগুলো থেকেও গ্রাহকদের কোনো রশিদ দেয়া হয়না। এসব ক্ষেত্রেও ভ্যাট ফাঁকির ঘটনা ঘটছে। আর রাঙামাটির রাজস্ব কর্তৃপক্ষ গড়পর্তায় যে ভাবে ভ্যাট আদায় করে থাকেন তাতে করে এ অঞ্চলটি পর্যটন অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত হলেও এখানে বেসরকারী পর্যায়ে আলাদা করে পর্যটনশিল্প চিহ্নিত হচ্ছে না। এ বিষয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে।

আঞ্চলিক রাজনীতি ও সাম্প্রদায়ীক ইস্যুতে
পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটনশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি :


মেধাভিত্তিক চাকুরিতে মুক্তিযুদ্ধ কোটা বাতিল আন্দোলন থেকে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে ‘জুলাই-আগস্ট বিপ্লব ২০২৪’ এর পর ২৭শে সেপ্টেম্বর বিশ^ পর্যটন দিবস ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটনশিল্প ব্যবসায়ীরা আশায় বুক বেধেছিলেন, যেহেতু- ড. মুহাম্মদ ইউনুস দেশের অন্তর্বতীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ একই সাথে বেসরকারী বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দ্বায়িত্বে থাকায় তারা পেছনের ক্ষতি পুশে আর্থিক দৈন্যতা ফেরাতে পারবেন। কিন্তু তা আর হলোনা।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিন পার্বত্য জেলায় সর্ব শেষ ৮ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটকদের ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন। একি সময় তিন জেলার জেলা প্রশাসকেরা এই নির্দেশনা জারি করেন। গত ৮ অক্টোবর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়। এর আগে ৩ অক্টোবর রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের সাজেকে পর্যটকদের না যেতে পরামর্শ দিয়েছিল জেলা প্রশাসন।
কারণ হিসেবে জানাগেছে, গত ৬ অক্টোবর রোববার ২০২৪, দুপুরে রাঙামাটি বনরূপা মৈত্রী বিহারে সংবাদ সম্মেলন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বৈদ্ধ সম্প্রদায়ের বড় ধর্শীয় উৎসব ‘কঠিন চীবরদান’ অনুষ্ঠান না করার সিদ্ধান্ত নেয় পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্মিলিত ভিক্ষু সংঘ। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে পার্বত্য ভিক্ষু