॥ রাঙামাটি রিপোর্ট ॥
নানা জল্পনা কল্পনা ও টানাপোড়েন কাটিয়ে অবশেষে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পূণর্গঠন করেছে সরকার। বিএনপি সরকার গঠনের ঠিক ছয়মাসের মাথায় এই প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো। সারা দেশের জেলা পরিষদগুলোর মধ্যে বিশেষ ক্ষমতা ভোগ করা তিন জেলা পরিষদসমূহ ১৯৯৮ সালে গঠনের পর থেকেই অন্তবর্তী পরিষদের মাধ্যমে চলে আসছে। সাধারণত: নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহ পুণর্গঠনের বিষয়টি অনেকটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এর আগে এই পরিষদগুলোর নাম স্থানীয় সরকার পরিষদ থাকার সময় মাত্র একবার নির্বাচনের মাধ্যমে পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর পরিষদ আইনে পবির্তন করে জেলা পরিষদ নাম করণ করা হলেও ভোটার তালিকা জটিলতায় নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরিষদ-১ শাখার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা পরিষদ তথা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠনের ঘোষনা প্রদান করা হয়। পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯; তিন জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ১৯৯৭-এর ১৬-ক(৪) উপধারা এবং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০১৪-এর ৪(২) ও ২(২) উপধারার ক্ষমতাবলে এই অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠন করা হয়েছে।
পুনর্গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সাবেক (সংরক্ষিন নারী) সংসদ সদস্য মিজ মাম্যাচিং মারমা। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দিপু এবং খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে কিছুদিন আগে ওই পরিষদের হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া ম্রাসা থোয়াই মারমা কে। এছাড়া, পার্বত্য জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০১৪-এর ৪(২) ধারা অনুযায়ী প্রতিটি জেলা পরিষদে চেয়ারম্যানের পাশাপাশি ১৪ জন করে সদস্য নিয়োগ পেয়েছেন।
ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ তৎকালীন পার্বত্য জেলাসমূহে শান্তির মাইলফল হিসেবে চিহ্নিত করে রাষ্ট্রপতি এরশাদের নেতৃত্বধীন সরকার ‘স্থানীয় সরকার পরিষদ’ নামে তিন পার্বত্য জেলায় বিশেষ তিনটি পরিষদ গঠন করে। মূলত এই পরিষদগুলোর তত্ত্ববধানেই পার্বত্য জেলাসমূহের যাবতীয় উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করার কথা। সে অনুযায়ী বিভিন্ন ধাপে জেলা পরিষদগুলোর নিকট ৩০টি বিষয়/বিভাগ হস্তান্তর করা হয়েছে। অবশ্য খাগড়াছড়িতে একটি ও বান্দরবানে ২টি কম রয়েছে। অবশ্য ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর সংশোধিত তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী মোট ৩৩টি বিষয়/কার্যাবলি জেলা পরিষদের কাছে ন্যাস্ত করার বিধান রয়েছে।
বৃহস্পতিবার জারি করা প্রজ্ঞাপনের বলা হয়, পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধান অনুযায়ী স্ব-স্ব জেলা পরিষদের দায়িত্ব পালন করবেন। ওই প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিগত ০৭ নভেম্বর ২০২৪ তারিখের ২৯.০০.০০০০.২১৪.১৮.০০২২.২৪-১১৯ নম্বর প্রজ্ঞাপন দ্বারা গঠিত পূর্বের পরিষদ বাতিল করা হয়েছে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তবর্তী সরকার পরিষদগুলো পুর্ণগঠনের ওই আদেশ জারি করেছিলেন। সে অনুযায়ী বিগত প্রায় ২১ মাস রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন কৃষিবিদ কাজল তালুকদার। ১৯৮৯ সালে গঠন করা স্থানীয় সরকার পরিষদে ২৫ জুন ১৯৮৯ সরাসরি নির্বচনের মাধ্যমে চেয়ারম্যান হন গৌতম দেওয়ান। রাঙামাটিতে একটি ঘটনার পর তিনি পদত্যাগ করলে ১৯৯২ সালের ১৭ জুন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন পারিজাত কুসুম চাকমা। তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য পদত্যাগ করেন এবং ১৯৯৬ সালের ২০ মার্চ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন রবীন্দ্র লাল চাকমা।
এর পর পার্বত্য চুক্তির পর পরিষদের নাম পরিবর্তন হয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন নতুন পরিষদে — ১৯৯৭ সালের ৫ জুলাই অন্তবর্তী চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন চিংকিউ রোয়াজা–। এর পর বিএনপি সরকারের আমলে ২০০২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি অন্তবর্তী চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন অধ্যাপক ড. মানিক লাল দেওয়ান। এ পর্যায়ে এক এগারর পট পরিবর্তনের কারণে ২০০৭ সালের ১৫ জুলাই অন্তবর্তী চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন প্রকৌশলী জগৎজ্যোতি চাকমা। ২০০৯ ফের আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে ২০০৯ সালের ২৫ মে অন্তবর্তী চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন নিখিল কুমার চাকমা। ২০১৪ নির্বাচনে শেখ হাসিনা ফের সরকার গঠন করলে ২০১৫ সালের ২৯ মার্চ অন্তবর্তী চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন বৃষকেতু চাকমা। ২০১৮ সালে আবার সরকার গঠন করে আ’লীগ এবং ২০২০ সালের ১৫ ডিসেম্বর অন্তবর্তী চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন অংসুই প্রু চৌধুরী। সর্বশেষ ২০২৪ এর নভেম্বর থেকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছিলেন বর্তমান চেয়ারম্যান দীপন তালুকদারের বড় ভাই কৃষিবিদ কাজল তালুকদার।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ পূণর্গঠন নিয়ে নব গঠিত বিএনপি সরকারের পার্বত্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং রাঙামাটি জেলা বিএনপির মধ্যে শুরু রশি টানাটানি। এর রেশ ধরেই পদত্যাগ বা পদচ্যুত হন নতুন নিয়োগ পাওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী এডভোকেট দীপেন দেওয়ান। রাঙামাটি নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্বের রেশে আটকে যায় অন্য দুই জেলা পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়াও। অবশেষে সেই ঝল্পনার অবসান হলো বটে, তবে এখনও পাহাড়ের আকাশে বাতাসে খবরের পিছনের খবর নিয়ে আরোচনার রেশ থেকেই গেলো।




























