বিশেষ প্রতিবেদন- ১০ এপ্রিল ২০১৭, দৈনিক রাঙামাটি: মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন-সার্বভৌম এ দেশ, সোনার বাংলা দেশ। কথাছিল ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময় অর্জিত এ দেশ পরিচালিত হবে- মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র ও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে লালিত হয়ে। কিন্তু ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার মাধ্যমে বাঙালির সে আশা ভূলুনঠিত হয়েছে। দীর্ঘ ২১শ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে সে ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল থেকে বেড়িয়ে আসতে। তার পরও আশাহত হতে হচ্ছে জাতি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফিরে পেলেও গণতন্ত্র ভূলুনঠিত। এ আবস্থায় বাঙালি জাতিকে ঐক্য বদ্য করতে বঙ্গরতœ বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার আবুল হোসেন (আবু) গঠন করেছেন ‘বেঙ্গল জাতীয় কংগ্রেস (বিজেসি)’। তিনি এ সংগঠনের সভাপতি। তার সে ঐক্য প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হলো।

মুক্তিযুদ্ধ- ১৯৭১: ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন-সার্বভৈৗম বাংলাদেশ পেয়েছি। এ যুদ্ধে আমরা হারিয়েছি ৩০ লক্ষের অধিক মা ও ভাই-বোনদের। সম্ভ্রম হারিয়েছেন ৩ লক্ষের অধিক মা ও বোন। জন্ম নিয়েছে ৫০ হাজার যুদ্ধ সন্তান, যাদেরকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ১ কোটিরও অধিক মানুষ দেশান্তরিত হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অভ্যন্তরীণভাবে ৫০ লক্ষেরও অধিক মানুষ গৃহহারা হয়েছিলেন। এ যুদ্ধে ৬ হাজার পাকসেনা, ৭ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ও ৮ হাজার ভারতীয় সেনা নিহত হন। এমন টালমাটাল পরিবেশে জনগণ আংশিকভাবে সামাজিক ন্যায় বিচার ও রাজনৈতিক অধিকার লাভ করেছে বটে, কিন্তু অদ্যাবধি আমরা অর্থনৈতিক মুক্তি পাইনি।
আওয়ামী লীগের সাড়ে ৩ বছরের শাসন: আমরা আশা করেছিলাম স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে যে সরকার প্রতিষ্ঠা হবে তা হবে গণমানুষের সরকার, কিন্তু আমরা দেখলাম ১৯৭২ খ্রিঃ থেকেই যে সরকার গঠিত হলো তা সম্ভবত: গণমানুষের সরকার নয়। বুর্জোয়া অর্থনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী ধনী শ্রেণীর সরকার। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহযোগীদের মধ্যে মার্কসবাদে বিশ্বাসী সিরাজুল আলম খান; চার খলিফার ২ খলিফা খ্যাত আ.স.ম আব্দুর রব ও শাজাহান সিরাজসহ ছাত্রলীগের আপসহীন নেতা কর্মীদের অনেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সরকারের রূপরেখা ও কর্মকান্ড মেনে নিতে পারেননি। তারা গঠন করলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। আওয়ামী লীগ সরকারের রক্ষীবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের নির্যাতনে প্রাণ হারালেন জাসদের ১৬/১৭ হাজার উঠতি বয়সের তরুণ দেশপ্রেমিক কর্মী। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগের দমন পীড়নকে রুখে দেয়ার জন্য জাসদ তৈরি করলো শুরুতে মেজর জলিলের ও পরবর্তীতে কর্ণেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। রক্ষীবাহিনীর ও সরকারের অন্যান্য পেটোয়া বাহিনীর অত্যাচারে ১৯৭৪ সালে জাসদের প্রকাশ্য রাজনীতি কার্যতঃ বন্ধ হয়ে গেল। নেপথ্য থেকে ভেসে এলো এক বিপ্লবী অনুপ্রেরণার মন্ত্র। ‘দেশে এখন যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে, এখানে সংগ্রাম অর্থ যুদ্ধ আর সংগঠন মানে সেনাবাহিনী’। এ শ্লোগানের রাজনৈতিকরূপ পরিগ্রহ করলো “বিপ্লবী গণবাহিনী”। গণবাহিনী, কমিউনিষ্ট ও সর্বহারা পার্টির সশস্ত্র পাল্টা প্রতিরোধে ১০/১২ হাজার আওয়ামী লীগের উঠতি বয়সের কর্মী প্রাণ হারালেন। প্রাণ হারালেন আওয়ামী লীগের ৬ জন সাংসদ। তদ্ব্যাতীত বিপ্লবী সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি বাঙালী জাতীয় জীবনে এক কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। বিপ্লবী সিরাজ সিকদার, মাও সে তুং এর ষ্টাইলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যে শ্রেণী শত্রু হিসেবে চিহ্নিত ধনীক শ্রেণীর দোসরদের ও সন্ত্রাসীদের খতম করা শুরু করলেন। এদেরকে দমনার্থে আওয়ামী লীগ সরকার রক্ষীবাহিনী নিয়োগ করলো। এতে প্রাণ হারালেন সর্বহারা পার্টির প্রায় ২/৩ হাজার উঠতি
বয়সের রাজনৈতিক কর্মী। জাসদও তার প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ক্যাডারদের হত্যায় মেতে উঠলো। তেমনিভাবে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও রক্ষীবাহিনী তার প্রতিপক্ষ জাসদের রাজনৈতিক ক্যাডারদের হত্যায় মেতে উঠলো। অপরপক্ষে কমিউনিষ্ট পার্টির একাংশ (হক-তোয়াহা গ্রুপ) বাম রাজনীতির কণ্ঠস্বর নোয়াখালীর মোহাম্মদ তোয়াহা এবং পাবনার আব্দুল হক মার্কসবাদী সমাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণায় লেনিন-স্ট্যালিন স্টাইলে আন্ডার গ্রাউন্ড রাজনীতিতে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে শ্রেণী শত্রু খতমে মেতে উঠলেন, সাথে যোগ দিলেন দেবেন শিকদার ও ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন; তাদেরকেও দমনার্থে আওয়ামী লীগ সরকার রক্ষীবাহিনী নিয়োগ করলো। এতে প্রাণ হারালেন কমিউনিষ্ট পার্টির প্রায় ৩/৪ হাজার উঠতি বয়সের কর্মী। এভাবে রাজনীতির ঘাত-প্রতিঘাতে কালের ¯্রােতে হারিয়ে গেলেন বাংলাদেশের উঠতি বয়সী সম্ভাবনাময় ৩৩/৩৪ হাজার রাজনৈতিক কর্মী। যাদের মধ্যে সম্ভবতঃ ২০/২১ হাজারই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সূর্য্য সন্তান। আওয়ামী লীগ সরকার জাসদের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করে জেলখানা ভরে ফেললো। রক্ষীবাহিনী সর্বশক্তি নিয়োগ করলো এদের দমনার্থে। সর্বোপরি দেশের রাজনীতি এক কঠিন ভয়াবহ রূপ ধারণ করলো। বিপ্লবী সিরাজ সিকদারকে বন্দী করে হত্যা করা হলো। রাজনীতির এমন কন্টকাকীর্ণ পরিস্থিতিতে ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ২৯০টি আসনে জয়লাভ করলো। সম্ভবতঃ ফলাফল পাল্টিয়ে হারানো হল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী)-র সিনিয়র সহ-সভাপতি ড. আলীম আল রাজী ও জাসদের সভাপতি মেজর এম.এ. জলিলসহ ১০/১২ জনকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সম্ভবতঃ এতদিনে বুঝতে পারলেন ‘দেশ বুর্জোয়াদের হাতে চলে গেছে, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা পাওয়ায় আংশিক সামাজিক ন্যায় বিচার ও রাজনৈতিক অধিকার আমরা পেয়েছি। কিন্তু জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি আজও আসেনি।’ জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে বিলুপ্ত করে গঠন করলেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী পার্টি-বাকশাল। বাকশালের কার্যক্রম চালু করতে না করতেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঢাকা ব্রিগেডের ল্যান্সার রেজিমেন্টের লে. কর্ণেল ফারুক রহমান ও আর্টিলারী রেজিমেন্টের লে. কর্ণেল আব্দুর রশিদের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী খন্দকার মোশতাক আহমদের নেপথ্যে পরিচালনায় সেনাবাহিনীর একটি অংশের আক্রমণে ১৫ আগষ্ট, ১৯৭৫ ভোররাতে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও শেখ মনিসহ সপরিবারে নিহত হলেন, প্রাণ হারালেন রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব কর্ণেল জামিল। এভাবে কালের ¯্রােতে ভেসে যায় জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির কর্মসূচি।
খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকার গঠন: ঐ সময়ে আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলো। সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্যাকে সরিয়ে দিয়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করা হলো। ইতোমধ্যে মোশতাক আহমদ তাঁর ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য ০৩ নভেম্বর ভোররাতে রিসালদার মোসলেম উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল সিপাহীকে পাঠালেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, মন্ত্রীপরিষদের সদস্য ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ.এইচ.এম কামরুজ্জামানকে হত্যা করার জন্য।

মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল: রাজনীতির এমন ঘাত-প্রতিঘাতে তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, কর্ণেল সাফায়াত জামিল, কর্ণেল নওয়াজীশ, কর্ণেল হায়দার, কর্ণেল হুদা প্রমুখের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ০৩ নভেম্বর, ১৯৭৫ ভোররাতে এক রক্তপাতহীন অভ্যূত্থান সংঘটিত হলো। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে সমর্থন দেয়ার জন্য কর্ণেল নওয়াজীশের নেতৃত্বে বগুড়া সেনানিবাস থেকে আগত সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ ইউনিট সংসদ ভবন সংলগ্ন এলাকায় ঘাটি স্থাপন করলো। মে. জে. জিয়াউর রহমানকে তাঁর বাসভবনে বন্দী করা হলো। বিমানবাহিনী প্রধান এম.জি তাওয়াব এবং নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার এডমিরাল মোশাররফ হোসেন খান অভ্যূত্থানকে পূর্ণ সমর্থন দিলেন। ক্ষমতার দ্বন্দ্বের এমন চরম মুহুর্তে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম.এ.জি ওসমানীর আপোস রফায় ট্যাংক বাহিনী দ্বারা পরিবেষ্টিত বঙ্গভবনে অবস্থানকারী ১৫ আগষ্ট, ১৯৭৫ ক্যুতে অংশগ্রহণকারী লে. কর্ণেল ফারুক ও লে. কর্ণেল রশিদসহ তাদের অন্যান্য সামরিক কর্মকর্তারা দেশ ত্যাগ করলেন। খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলো।
৭ নভেম্বর ১৯৭৫ জাসদের নেপথ্যে নেতৃত্বে সিপাহী বিপ্লব: বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করা হলো। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে মে. জে. পদে পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান করা হলো। মে. জে. খালেদ মোশাররফকে উপ-প্রধান সামরিক প্রশাসক করা হলো। এ সময় খালেদ মোশাররফের একজন অধঃস্তন সেনা কর্মকর্তা ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার জন্যে মে. জে. জিয়াউর রহমান ও খন্দকার মোশতাক আহমদসহ আরও ৪ জন রাজনীতিক ও ১৩ জন সেনা কর্মকর্তা অর্থাৎ মোট ১৯ জনের একটি তালিকা মে. জে. খালেদ মোশাররফের হাতে দিয়ে এদেরকে হত্যা করার অনুমতি চাইলেন। খালেদ মোশাররফ বললেন, জিয়া আমার বন্ধু। তাঁকে হত্যা করা হলে তোদেরকে পাখির মত গুলি করে মারব। ঐ সেনা কর্মকর্তা খালেদ মোশাররফকে স্যালুট দিয়ে প্রস্থান করলেন। গৃহবন্দী জিয়াউর রহমানের অনুরোধে ৭ নভেম্বর, ১৯৭৫ ভোররাতে জাসদ তথা কর্ণেল তাহেরের নেতৃত্বে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সহযোগিতায় ১৬৫ জন সুবেদার মেজরের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে সেনাবাহিনীর সিপাহী বিপ্লবে মুক্তিযুদ্ধে ক ফোর্সেস এর অধিনায়ক খালেদ মোশাররফ ক্ষমতাচ্যুত হলেন। জিয়াউর রহমানকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে আনলেন সিপাহীরা। এহেন অবস্থায় মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্ণেল হায়দার ও কর্ণেল হুদা সংসদ ভবন সংলগ্ন কর্ণেল নওয়াজীশের নেতৃত্বে পরিচালিত তাদের বিশ্বস্ত সেনা ইউনিটে আশ্রয় নিলেন।

মে. জে. খালেদ মোশাররফের পতন; জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহন ও সাড়ে ৪ বছরের সামরিক গণতন্ত্র: জাসদের ডাকসাইটের সামরিক নেতা জিয়াউর রহমান মুক্তি পেয়েই নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নেড়ে ব্রিগেডিয়ার পরবর্তীতে মে. জে. খালেদ মোশাররফ, কর্ণেল হায়দার ও কর্ণেল হুদাসহ অনেককে হত্যা করে সেনাবাহিনীতে ক্ষমতা সংহত করলেন এবং ডেপুটি চীফ মার্শাল ‘ল’ এডমিনিষ্ট্রেটর হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি রাষ্ট্রপতি ও চীফ মার্শাল “ল” এডমিনিষ্ট্রেটর বিচারপতি সায়েমকে সরিয়ে নিজে রাষ্ট্রপতি ও চীফ মার্শাল ল বনে গেলেন। সম্ভবতঃ জিয়াউর রহমানের বিশ্বাসঘাতকতায় জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে জাসদ ক্ষমতা নেয়ার জন্যে পুনরায় সিপাহী বিদ্রোহ করতে চেষ্টা চালায়। রাজনীতির এমন ঘাতপ্রতিঘাতে জিয়াউর রহমান কর্ণেল তাহেরকে কোর্ট মার্শাল করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করলেন। সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের মাধ্যমে জাসদের মেজর জলিল, আ.স.ম. আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজসহ ৯ জন নেতাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রদান করেন। সময়ের আবর্তনে অল্প সময়ের মধ্যে এ সকল নেতৃবৃন্দ মুক্তি পান। এ সময়ে বিমানবাহিনীর সদস্যরা মনে করলেন সিপাহী বিদ্রোহের মাধ্যমে তাঁরা যে আশার আলো দেখেছিলেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কর্মকান্ডে তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তাঁরা জিয়াকে হত্যা করার জন্য বিদ্রোহ করলেন। এ ঘটনার পূর্বেই জিয়া তা জানতে পেরে সেনাবাহিনীর মিরপুরস্থ ব্যাটালিয়নের একজন মেজরের নেতৃত্বে তাঁদেরকে দমনে পাঠালেন। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বহু সেনা প্র্ণা হারালেন। অবশেষে পরিস্থিতি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে। বিমানবাহিনীর বহু সদস্য গ্রেফতার হলেন। জিয়া তাদেরকে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করলেন।
মে. জে. আবুল মঞ্জুরের ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমানের পতন: ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের কথিত পরিচালনায় কর্ণেল মতি, কর্ণেল মাহবুব ও কর্ণেল ফজলে এলাহীর নেতৃত্বে সংঘটিত সামরিক ক্যুর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঢাকা সেনানিবাস থেকে সমর্থন না পাওয়ায় মঞ্জুরের কথিত সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থতায় পর্যবুসিত হলো। পালিয়ে যাওয়ার সময় চট্টগ্রাম সেনানিবাস এলাকায় কর্ণেল মতি ও কর্ণেল মাহবুব সেনা অফিসার/সদস্যদের পাল্টা আক্রমণে নিহত হলেন। ফটিকছড়িতে জে. মঞ্জুর গ্রেফতার হলেন। বন্দী অবস্থায় তাঁকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ফায়ারিং রেঞ্জ এলাকায় হত্যা করা হলো।
এ সামরিক ক্যুর ৪ দিন পূর্বে চট্টগ্রামের ভাটিয়ারীতে এক সামরিক কুঁচকাওয়াজে তৎকালীন সেনাপ্রধান হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদ অংশগ্রহণ করেন। তিনি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের বাসায় সকালের নাস্তা খান। ঐ সময় জেনারেল মঞ্জুর আর এরশাদ ব্যতীত অন্য কেউ সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। সেনা অফিসার মেসে দুপুরের খাবার গ্রহণ করেন। এ সময়ও কর্ণেল মতি ব্যতীত অন্য কেউ উপস্থিত ছিলেন না। বাজারে গুঞ্জন আছে, এরশাদ ক্ষমতায় আসার জন্য সম্ভবতঃ এক ঢিলে ২ পাখি মেরেছেন। জিয়া হত্যার বিচারে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে একজন ব্রিগেডিয়ারসহ কর্ণেল, মেজর, ক্যাপ্টেন ও লেফটেন্যান্ট লেভেলের ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হলো। মঞ্জুর হত্যা মামলা অদ্যাবধি আদালতে চলমান রয়েছে। এভাবে বাংলাদেশের জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি কালের ¯্রােতে হারিয়ে গেল।
মে. জে. হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ক্ষমতায় আরোহন- এরশাদের ৯ বছরের অর্থাৎ সাড়ে ৪ বছরের সামরিক গণতান্ত্রিক শাসন ও জাতীয় পার্টির সাড়ে ৪ বছরের শাসন: সময় পেরিয়ে যায়, এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ক্ষমতায় আসেন মে. জে. হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এরশাদ সাহেবের ৯ বছরের শাসনামলের মধ্যে সাড়ে ৪ বছরের সামরিক শাসন ও সাড়ে ৪ বছর ছিল জাতীয় পার্টির শাসন। ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। আওয়ামী লীগ উক্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও বিএনপি নির্বাচনে আসলো না। এ সময়ে বাংলাদেশে ভোট জালিয়াতির দ্বার উন্মুক্ত হয়। ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে পৌঁছানোর পূর্বেই অনেকের ভোট সীল মেরে তাঁর রাজনৈতিক ক্যাডাররা জাতীয় পার্টির প্রার্থীর পক্ষে ভোট বাক্স ভরে ফেলে। তাতেও আশানুরূপ আসন না পাওয়ায় জাতীয় সংসদের ৪৪ নির্বাচনী এলাকার ফলাফল পাল্টে দিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের জেতানো হয়। ড. কামাল হোসেনসহ এসব আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জিতেছিল। সূত্র ঐ সময়ের সাপ্তাহিক পত্রিকা “যায় যায় দিন”। এ রিপোর্ট লেখায় যায় যায় দিন এর সম্পাদক সাংবাদিক শফিক রেহমানকে লন্ডনে পালিয়ে গিয়ে ৬ বছরের নির্বাসনে থাকতে হলো। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৮ দলীয় জোট, বিএনপি-র নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট এবং শ্রী নির্মল সেনের নেতৃত্বে বাম ৬ দলীয় জোটের আন্দোলনের মূখে এরশাদ সাহেব ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়লেন। ইতোমধ্যে এরশাদ সাহেব দেশ চালালেন প্রায় ৯ বছর। কিন্তু স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ও উদ্দেশ্য বাংলার জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি ধরাছোয়ার বাইরেই থেকে যায়।
আমরা স্বাধীনতাপূর্ব পাকিস্তানের ২২ পরিবারের শোষণের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতাম। এখন স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ৫/৬ হাজার পরিবার সৃষ্টি হয়েছে, যাদের নিকট দেশের সম্ভবতঃ প্রায় অর্ধেক অর্থ-সম্পদ চলে গেছে। ধনী-গরীবের ব্যবধান আকাশচুম্বী। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয় দেখানো হয় ৫/৬ হাজার পরিবারের আয়ের সাথে গড় করে ১৬ কোটি মানুষের আয়। অর্থাৎ একজন ধনী ব্যক্তি যদি বছরে ৩০ কোটি টাকা আয় করেন অন্য একজন গরীব মানুষ মাসে ৫ হাজার অর্থাৎ বছরে ৬০ হাজার টাকা আয় করেন তবে সেক্ষেত্রে ২ জনের প্রত্যেকের গড় আয় দাঁড়ায় ১৫ কোটি ৩০ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ঐ গরীব মানুষটিরও বছরে আয় দাঁড়ায় ১৫ কোটি ৩০ হাজার টাকা। অথচ তিনি বছরে আয় করেন মাত্র ৬০ হাজার টাকা।
বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের আগমন; বিএনপি-র দ্বিতীয় বারের মত ৫ বছরের শাসন; ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম গঠন: ক্ষমতায় আসলেন মাননীয় প্রধান বিচারপতি সাহাবউদ্দিন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ক্ষমতায় এলো বিএনপি, নির্বাচনে হেরে গেল আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা বললেন নির্বাচনে সুক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে। তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. কামাল হোসেন বললেন, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে সুষ্ঠু হয়েছে। এ নিয়ে ড. কামাল হোসেনের সাথে টানাপোড়েন হওয়ায় ড. কামাল হোসেন রাগ করে ১৯৯৩ সালের ২৯ আগষ্ট আওয়ামী লীগের একাংশ, পঙ্কজ ভট্টাচার্জের নেতৃত্বে ন্যাপের একাংশ, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিকের নেতৃত্বে কমিউনিষ্ট পার্টির একাংশ ও শাজাহান সিরাজের নেতৃত্বে জাসদ (সিরাজ) এর সমন্বয়ে গঠন করলেন গণফোরাম। আজকের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, ব্যারিষ্টার আমীরুল ইসলাম গণফোরামে ছিলেন, পরে আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন। শেখ হাসিনার বক্তব্যও যেমন সত্য, ড. কামাল হোসেনের বক্তব্যও তেমনি সত্য। কারণ আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি বেশী করে ধনী ব্যবসায়ীদের নির্বাচনে নমিনেশন দিয়েছিল। তাঁরা নির্বাচনে অনেক টাকা খরচ করেছেন। বিএনপি নির্বাচনে বেশী টাকা খরচ করতে পারায় তাঁরা জনগণকে বেশী করে প্রভাবিত করতে পেরেছিল, বিধায় বিএনপি জয়ী হয়েছিল। ড. কামাল হোসেন অত্যন্ত ভদ্রলোক। তিনি সম্ভবতঃ বিষয়টি বুঝতে পারেননি। তাই তিনি বলেছিলেন, নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠু হয়েছে। অন্যান্য দলের নেতারা অর্থাভাবে জনগণকে প্রভাবিত করতে পারেননি। তাই নির্বাচনে তাঁরা আশানুরূপ আসন পাননি। এবারো জিতে গেলো ধনীক শ্রেণীর ব্যবসায়ী রাজনীতিকরা, হেরে গেলেন জনগণ, জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি ভূলুণ্ঠিত হলো। এভাবে বেগম খালেদা জিয়া গতানুগতিক রাষ্ট্র পরিচালনা করলেন ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় জ

















