সমাজে সৃজনশীলতা যে ভাবে হোঁচট খায় : লেক ভিউ পার্ক 

4

 

॥ আনোয়ার আল হক ॥

সমাজে সমালোচনার পথ উন্মুক্ত থাকা ভালো, তাতে অনেক ত্রুটি বিচ্যুতি সংশোধন হয়। সমালোচনা সমাজকে একটি প্রাণবন্ত, সচেতন এবং ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গঠনমূলক সমালোচনা- ‘মিথ্যা বা ভুল নীতিকে চিহ্নিত করে সত্য ও ন্যায়বিচারের পথ প্রশস্ত করে’। কিন্তু আমরা সমালোচনা করতে গিয়ে কোনো ভালো কাজকে মাঝপথে আটকে দিচ্ছি কিনা- সেটাও মনে রাখা জরুরী।

কারণ যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সততার সাথে নতুন বা ভালো কিছু করার উদ্যোগ নেয়, তখন অহেতুক সমালোচনা তাদের মনোবল ভেঙে দেয়; নতুন উদ্যোগ নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে যায়। এতে সমাজে সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে যায়। সমাজ স্থবির হয়ে পড়ে এবং নতুন উদ্ভাবন বা ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ সংকুচিত হয়।

পর্যটন শহর রাঙামাটিতে গড়ে ওঠা ‘লেক ভিউ গার্ডেনটি’ সর্ব মহলে প্রশংসিত হওয়া একটি উদ্যোগ। এরকম উদ্যোগ যাদের নেয়ার কথা না, তারা এই উদ্যোগটি নেওয়ায়- এর স্বপ্ন দ্রষ্টা ইঞ্জিনিয়ার সবুজ চাকমা ইতোমধ্যে সবার প্রশংসা কুড়িয়েছেন। স্থানীয়রা তো বটেই, সকল পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা এবং বাইরে থেকে আসা সৌন্দর্য পিপাসু পর্যটক; সবাই এই উদ্যোগটি জন্য সবুজ চাকমার প্রশংসায় পঞ্চমূখ।

কিন্তুরাঙামাটির মানুষ সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে কিছু মানুষের অপরিনামদর্শি সমালোচনা দেখে যেমন বিস্মিত হয়েছে, তেমনি এমন অর্বাচিন আলোচনায় আরো কিছু মানুষের অংশ গ্রহণে ব্যথিতও হয়েছে। সামাজিক মাধ্যম একটি অতি উন্মুক্ত প্লাটফরম। এখানে মতামত তুলে ধরতে যেমন দায়িত্বশীলতা বিবেচনায় থাকে না, বা যে বিষয়ে কেউ বক্তব্য দিচ্ছে সে বিষয়ের উপর তার জ্ঞান কতটুকু, অথবা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামতা কি তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। কারণ সামাজিক মাধ্যমের অর্বাচিন সংলাপগুলো বেশির ভাগ সময় অরণ্যে রোদনের মতই ব্রাত্য।

তবে লেকভিউ গার্ডেন নিয়ে সাম্প্রতিক ওঠা মৃদু বিতর্ক নিয়ে কিছু লেখার প্রয়োজনীয়তা এ জন্যই অনুভব করলাম যে, যেহেতু প্রকল্পটি এখনও মাঝপথে ঘুরপাক খাচ্ছে। সমালোচনার ভয়ে যদি সড়ক বিভাগও এ থেকে হাত গুটিয়ে নেয়, তা হলে কারো কিছু বলার থাকবে না; কারণ এটা তাদের কাজ নয়। বরং তারা সৎ চিন্তা থেকেই এমন একটি সৃজনশীল উদ্যোগ নিয়েছেন।

প্রথমেই বলে নেওয়া দরকার যে, এটি কোন শিশু পার্ক না। তাই এখানে শিশুদের উপযোগী কোন রাইড বসানো হয়নি। এটা রাস্তার পাশে অতিরিক্ত পড়ে থাকা একটা জায়গাকে ফুল, গাছ এবং লতা-পাতা দিয়ে সৌন্দর্য বর্ধন করা হয়েছে মাত্র। সড়ক বিভাগ এখানে সড়কটি নিরপদ করতে গিয়ে পাশে ধারক দেওয়াল করতে গিয়েছিল। ধারক দেওয়াল হওয়ার পর অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোর মতো এখানেও মাটি ভরাট করে ঢালাই দিয়ে ফেলতে তাদের কাজ শেষ হয়ে যেতো। কিন্তু নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা নিজে একজন পরিবেশ কর্মী ও সৃষ্টিশীল মানুষ হওয়ায় সেখানে বাড়তি কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে পতিত জায়গাটুকু দৃষ্টিনন্দন করার পাশাপাশি শহরবাসীর জন্য বিনা পয়সা মুক্ত শ্বাস নেওয়ার একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। বলাই বাহুল্য ইতোমধ্যে রাঙামাটি শহরে যে কয়টি পার্ক বা বাগান করা হয়েছে; সব কয়টাতেই কর্তৃপক্ষ নিজের মনে করে টোল সেন্টার বসিয়ে দিয়েছেন। ব্যবস্থাপনার নামে তারা ব্যবসা করছেন কিনা সেটা ভিন্ন বিতর্ক।

রাঙামাটি শহরের ফিসারি সড়ক বাঁধে গড়ে তোল সওজ এর লেকভিউ গার্ডেন এর পাথওয়ে নিয়ে যে সমালোচনা কেউ কেউ করছেন, সে বিসয়েই আজকে এই কলেবর। আমি ইচ্ছে করেই এখানে কিছু ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করছি, কারণ ক্ষেত্র অনুযায়ী কিছু শব্দের বাংলা রূপ তার প্রকৃত চিত্র ফুটিয়ে তুলতে পারে না। যাই হোক, লেক ভিউ গার্ডেনের ভিতর গড়ে তোলা যে pathway সম্পর্কে আলোচনা করছি- এটি মূলত landscape feature এর মধ্য দিয়ে হাঁটার একটি decorative pathway, সেখানে সাধারণ pedestrian pavement -এর মতো পুরোপুরি সমতল, continuous surface না থাকাটা দোষের বলা যায় না। বিভিন্ন স্থানে ঘোরার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, Landscape architecture – এ এ ধরণের gb stepping-stone/ open-joint paving হরহামেশাই ব্যবহৃত হয়।

এই পদ্ধতির সুবিধা হলো : এর ফাঁক দিয়ে সহজেই বৃষ্টির পানি মাটিতে যেতে পারে। পুরো জায়গা কংক্রিটে ঢেকে না ফেললে স্টোনের ফাঁকে ফাঁকে ঘাস উঠে দেখতে প্রাকৃতিক লাগে; সবুজের সংমিশ্রণে বাগানের পরিবেশের সঙ্গে ভালোভাবে মিশে যায়; এমনকি পানি জমার প্রবণতাও থাকে না।

ভুলে গেলে চলবে না যে, এটা মূলত কোনো পার্ক নয়। অতিরিক্ত উদ্যোগ হিসেবে নেওয়া রাঙামাটির লেক ভিউ গার্ডেনের লন, যদি এটি একটি সাধারণ public park হতো এবং ওই পথটি লনের মধ্য দিয়ে সাধারণ পারাপার বা হাঁটার পথ হতো, তাহলে এটিকে শিশুদের playground-Gi safety standard দিয়ে বিচার করার প্রয়োজন হতো।

আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সবার জন্য অ্যাক্সেস থাকে না। তাই বলে কি আমরা ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিরুৎসাহিত করবো ? সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনা অবশ্যই জননিরাপত্তা বিবেচনায় তৈরি হতে হবে; কিন্তু তার প্রতিটি উপাদানকে প্রত্যেক বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও ব্যক্তিগত পছন্দের মানুষের জন্য একইভাবে ব্যবহারযোগ্য করতে হবে; এমন কোনো সার্বজনীন নীতি নেই। এমন দাবি বাস্তবসম্মতও নয়।

এমনকি একটি শিশু পার্কেও একটি রাইড সবার জন্য করা হয় না, এটা খুব স্বাভাবিক। অনেকে উঁচু রাইডিং এ উঠতে পারে না, বমি হয়, ভয় পায়- তাই বলে উঁচু রাইডিং বন্ধ করে দেওয়া হয় না। একটি কায়াকিং নৌকা সবার জন্য হয়না, এটাই স্বাভাবিক ; মোটা, বয়স্ক সবার জন্য উপযোগী নৌকা থাকা জরুরি নয়।

একটি climbing structure শিশুদের নির্দিষ্ট বয়সের জন্য স্বাভাবিক। একটি decorative garden path wheelchair -এর জন্য উপযুক্ত নয় , সেটিও সবসময় ত্রুটি নয়। একটি সাধারণ পার্কে শিশু আসবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে পার্কের প্রতিটি পাথর, প্রতিটি বেঞ্চ, প্রতিটি সিঁড়ি, প্রতিটি জলাধার, প্রতিটি landscape feature -কে শিশুদের খেলনার মতো করে নিরাপদ করতে হবে।

যেমন- একটি পার্কের পাশে যদি পুকুর থাকে, সেখানে শিশু পড়ে যেতে পারে। তাই বলে পুকুর তুলে ফেলতে হবে না। বরং যথাযথভাবে বাউন্ডারি বা রেলিং সতর্কতা প্রয়োজন হতে পারে। একইভাবে কোনো পার্কে যদি উঁচু জায়গা থাকে, সেখানে শিশু উঠে- পড়ে যেতে পারে। সমাধান হলো প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। উঁচু জায়গাটিই নির্মাণ করা যাবে না, এমন নয়।

মনে রাখা জরুরি যে, কোনো স্থাপনা সবার জন্য উপযোগী না হওয়া সমস্যা নয়। তবে কোনো স্থাপনা অপ্রত্যাশিতভাবে বিপজ্জনক হওয়া সমস্যা। সম্প্রতি সওজ লেক ভিউ গার্ডেন নিয়ে কেউ কেউ আহেতুক সমালোনা করে পোস্ট দিচ্ছেন। আর এমন একটি ভালো উদ্যোগের বিপরীতে বেশ কিছু মানুষ যেভাবে নেতিবাচক মন্তব্য করছে, তাতে ভবিষ্যতে কেউ ভালো উদ্যোগ নেওয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলতে পারে ভেবে সবার জানার জন্য বিষয়টি অবতারণা করলাম।